ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি কি?

Zamil Islam
0

ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি

আমরা যখন রাতের মেঘমুক্ত আকাশের দিকে তাকাই, তখন হাজার হাজার নক্ষত্র, গ্রহ আর ছায়াপথ দেখতে পাই। বিজ্ঞানীদের মতে, এই দৃশ্যমান জগৎ—যা আমরা টেলিস্কোপ দিয়ে দেখি বা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করি—তা পুরো মহাবিশ্বের মাত্র ৫ শতাংশ। বাকি ৯৫ শতাংশই আমাদের চোখের আড়ালে লুকিয়ে আছে। এই রহস্যময় বিশাল অংশটিকেই বলা হয় ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter) এবং ডার্ক এনার্জি (Dark Energy)।

ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি
ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি 

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন কিছুকে ব্যাখ্যা করা যা দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না, এমনকি সাধারণ কোনো যন্ত্র দিয়ে শনাক্তও করা যায় না। মানুষ যুগ যুগ ধরে ভেবে এসেছে যে মহাবিশ্ব মানেই হলো গ্রহ, নক্ষত্র আর ধূলিকণা। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে এসে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারলেন, মহাবিশ্বের মূল চালিকাশক্তি আসলে এমন কিছু উপাদান, যা কোনো আলো প্রতিফলন বা শোষণ করে না। ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি হলো সেই আধুনিক বিজ্ঞানের এক অমীমাংসিত রোমাঞ্চকর রহস্য।

মহাবিশ্বের অদৃশ্য অধ্যায়: ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি

মহাবিশ্বের গঠনশৈলী বুঝতে গেলে আমাদের এর উপাদানগুলোর অনুপাত জানতে হবে। নাসার তথ্যমতে, মহাবিশ্বের মোট উপাদানের প্রায় ৬৮% হলো ডার্ক এনার্জি এবং ২৭% হলো ডার্ক ম্যাটার। আমাদের পরিচিত দৃশ্যমান পদার্থ (Normal Matter) মাত্র ৫%। অর্থাৎ, আমরা যা কিছু জানি—পরমাণু, কোষ, পাহাড়-পর্বত, এমনকি বিশাল সূর্য—সবই এই ক্ষুদ্র ৫ শতাংশের অংশ। বাকি ৯৫ শতাংশই হলো ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির এক বিশাল মহাসমুদ্র যা পুরো মহাকাশকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter): মহাজাগতিক আঠা

ডার্ক ম্যাটার হলো এমন এক ধরণের পদার্থ যা কোনো আলো বা বিদ্যুৎ-চৌম্বকীয় বিকিরণ নির্গত, শোষণ বা প্রতিফলন করে না। তাই একে আমরা সরাসরি কোনো টেলিস্কোপ দিয়ে দেখতে পাই না। একে বিজ্ঞানীদের ভাষায় "মহাজাগতিক আঠা" বলা হয় কারণ এটি গ্যালাক্সিগুলোকে তাদের নির্দিষ্ট কাঠামোতে ধরে রাখতে সাহায্য করে। যদি এই অদৃশ্য পদার্থের অস্তিত্ব না থাকত, তবে গ্যালাক্সিগুলো তাদের ঘূর্ণন গতির কারণে অনেক আগেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত।

ডার্ক ম্যাটার কেন আছে বলে আমরা মনে করি?

১৯৩০-এর দশকে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রিটজ জুইকি এবং ১৯৭০-এর দশকে ভেরা রুবিন লক্ষ্য করেন যে, গ্যালাক্সিগুলোর বাইরের দিকের নক্ষত্রগুলো কল্পনার চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত গতিতে ঘুরছে। মহাকর্ষ বলের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, দৃশ্যমান পদার্থের ভরের ওপর ভিত্তি করে এই নক্ষত্রগুলোর ছিটকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারা ছিটকে যাচ্ছে না। এর মানে হলো, সেখানে এমন কোনো অদৃশ্য ভর আছে যা অতিরিক্ত মাধ্যাকর্ষণ শক্তি সরবরাহ করছে। এই অদৃশ্য ভরই হলো ডার্ক ম্যাটার যা পুরো গ্যালাক্সিকে একটি জালের মতো পেঁচিয়ে রেখেছে।

মহাকর্ষীয় লেন্সিং (Gravitational Lensing): অদৃশ্যকে দেখার উপায়

ডার্ক ম্যাটার সরাসরি দেখা না গেলেও এর প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, বিশাল ভরের কোনো বস্তু তার চারপাশের স্থান-কালকে (Space-time) বাঁকিয়ে দেয়। যখন দূরবর্তী কোনো গ্যালাক্সি থেকে আলো আসে এবং পথে ডার্ক ম্যাটারের স্তূপ থাকে, তখন সেই আলোটি বেঁকে যায়। একে বলা হয় মহাকর্ষীয় লেন্সিং। অনেকটা লেন্সের মতো কাজ করে এই অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটার পেছনের বস্তুকে বিকৃত বা বড় করে দেখায়। এই পর্যবেক্ষণ থেকেই বিজ্ঞানীরা ডার্ক ম্যাটারের মানচিত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।

ডার্ক ম্যাটার কি দিয়ে গঠিত? (WIMPs ও অন্যান্য কণা)

ডার্ক ম্যাটার আসলে কী দিয়ে তৈরি, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক আছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় ধারণা হলো WIMPs (Weakly Interacting Massive Particles)। এগুলো এমন কণা যা সাধারণ পদার্থের মধ্য দিয়ে অনায়াসে চলে যেতে পারে কিন্তু এদের ভর অনেক বেশি। এছাড়া অ্যাক্সিয়ন (Axions) বা স্টেরাইল নিউট্রিনো নামক কণার কথাও বিজ্ঞানীরা ভাবছেন। আবার অনেকে মনে করেন ডার্ক ম্যাটার কোনো কণা নয়, বরং আমাদের মহাকর্ষ সংক্রান্ত সূত্রে কোনো ভুল আছে যা সংশোধন করা প্রয়োজন।

ডার্ক এনার্জি (Dark Energy): মহাজাগতিক বিকর্ষণ

ডার্ক ম্যাটার যদি মহাবিশ্বকে জোড়া লাগিয়ে রাখতে চায়, তবে ডার্ক এনার্জি ঠিক তার উল্টো কাজ করে। এটি মহাবিশ্বকে চারদিকে টেনে প্রসারিত করছে। একে বলা হয় "মহাজাগতিক বিকর্ষণ"। এটি মহাকাশের প্রতিটি বিন্দুতে বিদ্যমান এক রহস্যময় শক্তি যা গ্যালাক্সিগুলোকে একে অপরের থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। মজার ব্যাপার হলো, মহাবিশ্ব যত বড় হচ্ছে, ডার্ক এনার্জির পরিমাণ বা প্রভাব তত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ডার্ক এনার্জির আবিষ্কার ও প্রসারণশীল মহাবিশ্ব

১৯৯৮ সালে টাইপ ওয়ান-এ (Type Ia) সুপারনোভা পর্যবেক্ষণের সময় বিজ্ঞানীরা এক বিস্ময়কর তথ্য পান। তারা লক্ষ্য করেন যে মহাবিশ্ব কেবল প্রসারিতই হচ্ছে না, বরং এই প্রসারণের গতি সময়ের সাথে সাথে বাড়ছে। আগে ধারণা করা হয়েছিল যে মাধ্যাকর্ষণের টানে একসময় মহাবিশ্বের প্রসারণ ধীর হয়ে যাবে। কিন্তু ডার্ক এনার্জি নামক এই শক্তিটি মহাবিশ্বকে অবিশ্বাস্য গতিতে প্রসারিত করছে। এই আবিষ্কারের জন্য ২০১১ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।

ডার্ক এনার্জি ও মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি

ডার্ক এনার্জির প্রভাব মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। যদি ডার্ক এনার্জি এভাবে মহাবিশ্বকে প্রসারিত করতে থাকে, তবে কয়েক বিলিয়ন বছর পর আকাশ থেকে সব গ্যালাক্সি হারিয়ে যাবে। আমরা শুধু আমাদের নিজস্ব গ্যালাক্সি ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাব না। এই অবস্থাকে বলা হয় "Big Freeze" বা মহাজাগতিক হিমায়ন, যেখানে মহাবিশ্ব একদম শীতল ও অন্ধকার হয়ে যাবে। আবার ডার্ক এনার্জি যদি আরও শক্তিশালী হয়, তবে এটি পরমাণু পর্যন্ত ছিঁড়ে ফেলতে পারে, যাকে বলা হয় "Big Rip"।

এগুলো কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং আমাদের অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। যদি ডার্ক ম্যাটার না থাকতো, তবে গ্যালাক্সিগুলো তৈরি হতো না এবং গ্রহ-নক্ষত্রগুলো মহাকাশে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ত। অন্যদিকে, ডার্ক এনার্জি যদি না থাকতো, তবে মাধ্যাকর্ষণের টানে মহাবিশ্ব হয়তো অনেক আগেই চুপসে গিয়ে ধ্বংস হয়ে যেত। মহাবিশ্বের শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিবর্তন বুঝতে গেলে এই দুটি অদৃশ্য শক্তির মিথস্ক্রিয়া বোঝা অপরিহার্য।

বর্তমান গবেষণা ও ভবিষ্যৎ অভিযান

বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জির রহস্য উন্মোচনে কাজ করে যাচ্ছেন। সুইজারল্যান্ডের Large Hadron Collider (LHC) ল্যাবে ডার্ক ম্যাটারের কণা খোঁজা হচ্ছে। মহাকাশে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ইউক্লিড (Euclid) মিশন পাঠানো হয়েছে ডার্ক এনার্জির ম্যাপ তৈরি করতে। এই বিশাল বিনিয়োগের উদ্দেশ্য একটাই—মহাবিশ্বের বাকি ৯৫ শতাংশের পরিচয় খুঁজে বের করা।

ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি হলো মহাবিশ্বের সেই বিশাল ক্যানভাস, যার ওপর নক্ষত্র আর গ্রহগুলো কেবল ছোট ছোট বিন্দুর মতো। আমরা আমাদের দৃশ্যমান জগৎ নিয়ে যতই গর্ব করি না কেন, মহাবিশ্বের সিংহভাগই এখনও আমাদের কাছে এক বড় রহস্য। তবে বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় আশা করা যায় যে একদিন এই অদৃশ্য জগতের রহস্য উন্মোচিত হবে। সেদিন হয়তো আমরা মহাবিশ্বের জন্ম, স্থিতি এবং এর চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে সঠিক উত্তরটি খুঁজে পাব। মহাকাশ বিজ্ঞানের এই রোমাঞ্চকর যাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জানার কোনো শেষ নেই।

তথ্য সূত্রঃ উইকিপিডিয়া

আরো পড়ুনঃ সৌরজগৎ কি?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!