প্লুটো গ্রহ কিভাবে হারিয়ে গেলো?
এক সময় সৌরজগতের নবম গ্রহ হিসেবে পরিচিত প্লুটো আজ আর “গ্রহ” নয়—এই তথ্য অনেকের কাছেই অবাক করার মতো। তাহলে কি প্লুটো সত্যিই হারিয়ে গেছে? নাকি এটি এখনো আছে, কিন্তু তার পরিচয় বদলে গেছে? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ইতিহাস, বিজ্ঞান ও মহাকাশ গবেষণার এক চমৎকার যাত্রায়। এই লেখায় আমরা সহজ ভাষায় জানবো প্লুটোর আবিষ্কার থেকে শুরু করে কেন তাকে গ্রহের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হলো এবং আজ তার অবস্থান কোথায়।প্লুটোর আবিষ্কার: নবম গ্রহের উত্থান
১৯৩০ সালে মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্লাইড টমবগ প্লুটো আবিষ্কার করেন। সে সময় বিজ্ঞানীরা ধারণা করছিলেন যে নেপচুনের বাইরে আরও একটি বড় গ্রহ থাকতে পারে, যাকে তারা “প্ল্যানেট এক্স” নামে ডাকতেন। এই ধারণার ভিত্তিতেই শুরু হয় অনুসন্ধান।
দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের পর টমবগ একটি ক্ষুদ্র আলোকবিন্দু খুঁজে পান, যা পরে প্লুটো হিসেবে পরিচিত হয়। তখনকার প্রযুক্তি অনুযায়ী এটি যথেষ্ট বড় বলে মনে হয়েছিল এবং দ্রুতই এটি সৌরজগতের নবম গ্রহ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের পর টমবগ একটি ক্ষুদ্র আলোকবিন্দু খুঁজে পান, যা পরে প্লুটো হিসেবে পরিচিত হয়। তখনকার প্রযুক্তি অনুযায়ী এটি যথেষ্ট বড় বলে মনে হয়েছিল এবং দ্রুতই এটি সৌরজগতের নবম গ্রহ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
![]() |
| প্লুটো গ্রহ |
প্লুটোর নামকরণ
প্লুটো নামটি এসেছে রোমান পুরাণের পাতাল দেবতা “Pluto” থেকে। এই নামটি প্রস্তাব করেছিলেন ইংল্যান্ডের এক কিশোরী, ভেনেশিয়া বার্নি।
প্লুটো নিয়ে সন্দেহ দানা বাঁধলো কেনো?
সময়ের সাথে সাথে বিজ্ঞানীরা আরও উন্নত টেলিস্কোপ ব্যবহার করতে শুরু করেন এবং প্লুটো সম্পর্কে নতুন তথ্য পেতে থাকেন। তখনই শুরু হয় সন্দেহ।
আকার ও ভর
প্লুটোর আকার পৃথিবীর চাঁদের চেয়েও ছোট। এর ভরও খুবই কম। একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রহের তুলনায় এটি অনেক ছোট হওয়ায় প্রশ্ন উঠতে শুরু করে—এটি কি সত্যিই গ্রহ?কক্ষপথের অদ্ভুত আচরণ
প্লুটোর কক্ষপথ অন্যান্য গ্রহের মতো নয়। এটি অনেক বেশি উপবৃত্তাকার এবং কখনো কখনো নেপচুনের কক্ষপথের ভেতরে ঢুকে পড়ে। এটি গ্রহের স্বাভাবিক আচরণের সাথে পুরোপুরি মেলে না।নতুন বস্তু আবিষ্কার
১৯৯০-এর দশক থেকে বিজ্ঞানীরা প্লুটোর আশেপাশে অনেক ছোট বরফময় বস্তু আবিষ্কার করেন, যেগুলো “কুইপার বেল্ট” নামে পরিচিত অঞ্চলে রয়েছে। এই বস্তুগুলোর অনেকগুলোই প্লুটোর মতোই। ফলে প্রশ্ন ওঠে—যদি প্লুটো গ্রহ হয়, তাহলে এদেরও কি গ্রহ বলা হবে?২০০৬ সালের সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত
২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংঘ (IAU) একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যা প্লুটোর ভাগ্য বদলে দেয়।
আশ্চর্যজনক বৈশিষ্ট্য
বিজ্ঞানীদের মতভেদ
কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, প্লুটোর জটিল গঠন ও বৈশিষ্ট্যের কারণে এটিকে আবার গ্রহ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। অন্যরা IAU-এর সংজ্ঞাকেই সঠিক মনে করেন।
সাধারণ মানুষের আবেগ
অনেক মানুষের কাছে প্লুটো এখনো নবম গ্রহ। এটি শুধু বৈজ্ঞানিক বিষয় নয়, আবেগের সাথেও জড়িত।
গ্রহের নতুন সংজ্ঞা
IAU একটি গ্রহ হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত নির্ধারণ করে-- সূর্যের চারদিকে ঘুরতে হবে।
- নিজস্ব মাধ্যাকর্ষণে গোলাকার হতে হবে।
- নিজের কক্ষপথ পরিষ্কার রাখতে হবে।
ফলাফল
এই কারণে প্লুটোকে গ্রহের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে “বামন গ্রহ” হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই সাথে সৌরজগতের গ্রহ সংখ্যা ৯ থেকে কমে ৮-এ দাঁড়ায়।বামন গ্রহ (Dwarf Planet) হিসেবে নতুন যাত্রা
প্লুটোকে গ্রহ থেকে বাদ দেওয়া হলেও এটি হারিয়ে যায়নি। বরং এটি একটি নতুন শ্রেণিতে স্থান পেয়েছে—বামন গ্রহ।বামন গ্রহ কী?
বামন গ্রহ হলো এমন বস্তু, যা সূর্যের চারদিকে ঘোরে, গোলাকার আকৃতির হয়, কিন্তু নিজের কক্ষপথ পরিষ্কার করতে পারে না।প্লুটোর নতুন পরিচয়
আজ প্লুটো কুইপার বেল্টের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বামন গ্রহ। এর পাশাপাশি আরও কিছু বামন গ্রহ রয়েছে, যেমন এরিস, হাউমেয়া ও মাকেমাকে।নিউ হরাইজনস মিশন: প্লুটোর আসল রূপ
২০১৫ সালে নাসার “নিউ হরাইজনস” মহাকাশযান প্লুটোর কাছাকাছি পৌঁছায় এবং আমাদের সামনে প্লুটোর এক নতুন রূপ তুলে ধরে।আশ্চর্যজনক বৈশিষ্ট্য
- প্লুটোর পৃষ্ঠে বরফের পাহাড় রয়েছে।
- সেখানে নাইট্রোজেনের সমতল ভূমি দেখা গেছে।
- এর হৃদয় আকৃতির অঞ্চল “টম্বো রেজিও” খুবই বিখ্যাত।
সক্রিয় ভূগঠন
বিজ্ঞানীরা অবাক হয়ে দেখেন যে প্লুটো একটি “মৃত” গ্রহ নয়। সেখানে এখনো ভূতাত্ত্বিক কার্যকলাপ চলছে।বিতর্ক কি শেষ হয়েছে?
প্লুটোকে গ্রহ হিসেবে ফিরিয়ে আনার দাবি আজও থামেনি।বিজ্ঞানীদের মতভেদ
কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, প্লুটোর জটিল গঠন ও বৈশিষ্ট্যের কারণে এটিকে আবার গ্রহ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। অন্যরা IAU-এর সংজ্ঞাকেই সঠিক মনে করেন।
সাধারণ মানুষের আবেগ
অনেক মানুষের কাছে প্লুটো এখনো নবম গ্রহ। এটি শুধু বৈজ্ঞানিক বিষয় নয়, আবেগের সাথেও জড়িত।
প্লুটোর উপগ্রহসমূহ
প্লুটোকে ঘিরে রয়েছে মোট পাঁচটি উপগ্রহ, যা এই ছোট বামন গ্রহটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উপগ্রহ হলো Charon, যা আকারে প্লুটোর প্রায় অর্ধেক। Charon এতটাই বড় যে অনেক বিজ্ঞানী প্লুটো ও Charon-কে একসাথে একটি “ডাবল সিস্টেম” হিসেবে বিবেচনা করেন। এছাড়াও প্লুটোর আরও চারটি ছোট উপগ্রহ রয়েছে—Nix, Hydra, Kerberos এবং Styx। এই উপগ্রহগুলো প্লুটোর চারপাশে জটিল কক্ষপথে ঘোরে, যা মহাকাশবিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত আগ্রহের বিষয়।কুইপার বেল্ট: প্লুটোর আসল প্রতিবেশ
প্লুটো আমাদের সৌরজগতের এক প্রান্তে অবস্থিত একটি অঞ্চলে রয়েছে, যার নাম Kuiper Belt। এটি সূর্য থেকে অনেক দূরে বিস্তৃত একটি বরফময় এলাকা, যেখানে অসংখ্য ছোট গ্রহাণু ও বামন গ্রহ ছড়িয়ে আছে। আগে মনে করা হতো প্লুটো একাই এই অঞ্চলের প্রধান বস্তু, কিন্তু পরবর্তীতে আরও অনেক অনুরূপ বস্তু আবিষ্কারের ফলে বোঝা যায় যে প্লুটো আসলে একটি বৃহৎ পরিবারের অংশ। এই আবিষ্কারই মূলত প্লুটোর গ্রহত্ব নিয়ে বিতর্কের সূচনা করে।প্লুটোর বায়ুমণ্ডল
প্লুটোর একটি অত্যন্ত পাতলা বায়ুমণ্ডল রয়েছে, যা প্রধানত নাইট্রোজেন, মিথেন এবং কার্বন মনোক্সাইড দিয়ে তৈরি। তবে এই বায়ুমণ্ডল স্থায়ী নয়—প্লুটো যখন সূর্যের কাছাকাছি আসে, তখন বরফ গলে গ্যাসে পরিণত হয়ে বায়ুমণ্ডল তৈরি করে। আবার সূর্য থেকে দূরে সরে গেলে এই গ্যাস জমে বরফে পরিণত হয়। ফলে প্লুটোর বায়ুমণ্ডল অনেকটাই মৌসুমি বৈশিষ্ট্যের, যা একে অন্য গ্রহগুলোর তুলনায় আলাদা করে তোলে।প্লুটোর তাপমাত্রা
প্লুটো সৌরজগতের অন্যতম শীতল জ্যোতিষ্ক। এর গড় তাপমাত্রা প্রায় -২২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা এতটাই কম যে অধিকাংশ গ্যাস এখানে কঠিন বরফে পরিণত হয়। সূর্য থেকে অত্যন্ত দূরে থাকার কারণে প্লুটো খুব কম আলো ও তাপ পায়। তবুও আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত ঠান্ডা পরিবেশেও প্লুটোর পৃষ্ঠে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন ও ভূতাত্ত্বিক কার্যকলাপ লক্ষ্য করা গেছে।প্লুটোর একদিন ও একবছর
প্লুটোর সময়চক্র পৃথিবীর তুলনায় একেবারেই ভিন্ন। প্লুটো নিজের অক্ষে একবার ঘুরতে প্রায় ৬.৪ পৃথিবী দিনের সমান সময় নেয়। অন্যদিকে, সূর্যের চারদিকে একবার ঘুরে আসতে প্লুটোর সময় লাগে প্রায় ২৪৮ পৃথিবী বছর। অর্থাৎ প্লুটোর একটি বছর মানে আমাদের পৃথিবীর বহু প্রজন্মের সময়। এই দীর্ঘ সময়চক্র প্লুটোর আবহাওয়া ও পরিবেশকে আরও জটিল করে তোলে।প্লুটো কেন “হারিয়ে যায়নি”
অনেকেই মনে করেন প্লুটো সৌরজগত থেকে হারিয়ে গেছে, কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। প্লুটো এখনও আগের মতোই তার কক্ষপথে ঘুরছে এবং সৌরজগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রয়েছে। শুধুমাত্র এর পরিচয় বদলেছে—এখন এটি একটি বামন গ্রহ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ। বরং নতুন এই পরিচয়ের কারণে প্লুটো নিয়ে গবেষণা আরও বেড়েছে এবং বিজ্ঞানীরা এটিকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করেছেন।ভবিষ্যতে কি আবার গ্রহ হবে?
প্লুটোকে আবার গ্রহ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে কিনা, তা এখনো একটি বিতর্কিত বিষয়। কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, গ্রহের সংজ্ঞা পরিবর্তন করলে প্লুটো আবার গ্রহের মর্যাদা পেতে পারে। আবার অন্যরা বর্তমান সংজ্ঞাকেই যথাযথ মনে করেন। তাই ভবিষ্যতে নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার বা সিদ্ধান্ত এলে প্লুটোর অবস্থান আবার পরিবর্তিত হতে পারে।প্লুটো আসলে হারিয়ে যায়নি—তার পরিচয় বদলেছে। এক সময়ের নবম গ্রহ আজ বামন গ্রহ হিসেবে নতুন পরিচয়ে আমাদের সৌরজগতের অংশ হয়ে আছে। বিজ্ঞান সব সময় পরিবর্তনশীল, আর নতুন তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত বদলানোই এর শক্তি।
প্লুটোর গল্প আমাদের শেখায় যে মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান এখনও অসম্পূর্ণ, এবং প্রতিদিন নতুন কিছু জানার সুযোগ রয়েছে। তাই প্লুটো হারিয়ে যায়নি—বরং আমাদের জ্ঞানের জগতে নতুন আলো যোগ করেছে।
তথ্য সূত্রঃ উইকিপিডিয়া
আরো পড়ুনঃ

