গ্রহ কি?

Zamil Islam
0

মহাবিশ্বের বিস্ময়: গ্রহ কী এবং কেন এরা এত রহস্যময়?

মহাকাশের অসীম শূন্যতায় ছড়িয়ে আছে কোটি কোটি নক্ষত্র, ধূলিকণা আর গ্যাস। কিন্তু আমাদের কাছে সবচেয়ে কৌতূহলের বিষয় হলো সেইসব মহাজাগতিক বস্তু, যাদের আমরা 'গ্রহ' বলে চিনি। মানুষ অনাদিকাল থেকেই আকাশের দিকে তাকিয়ে উজ্জ্বল বিন্দুগুলোকে নড়াচড়া করতে দেখেছে। আজ বিজ্ঞানের কল্যাণে আমরা জানি, সেই বিন্দুগুলো আসলে বিশাল একেকটি জগৎ। এই প্রবন্ধে আমরা গ্রহের সংজ্ঞা থেকে শুরু করে তাদের জন্মরহস্য এবং ভিনগ্রহের প্রাণের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

planet
গ্রহ সমূহ

গ্রহের সংজ্ঞা: ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন (IAU) এর মানদণ্ড

'গ্রহ' শব্দটি গ্রিক শব্দ 'Planētēs' থেকে এসেছে, যার অর্থ 'ভ্রাম্যমাণ'। আগে মহাকাশে ঘূর্ণায়মান প্রায় যেকোনো বড় বস্তুকে গ্রহ বলা হতো। কিন্তু ২০০৬ সালে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন (IAU) গ্রহের একটি সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করে। একটি মহাজাগতিক বস্তুকে গ্রহ হতে হলে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়-

নক্ষত্রের চারদিকে আবর্তন: বস্তুটিকে অবশ্যই একটি নক্ষত্রকে (যেমন আমাদের সূর্য) কেন্দ্র করে ঘুরতে হবে।

গোলাকার আকৃতি: বস্তুটির যথেষ্ট ভর থাকতে হবে যাতে নিজস্ব অভিকর্ষ বলের টানে সেটি একটি প্রায় গোলাকার আকৃতি ধারণ করে।
কক্ষপথ পরিষ্কার রাখা: এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। একটি গ্রহকে তার কক্ষপথের চারপাশ থেকে অন্যান্য ছোট ছোট মহাজাগতিক বস্তু বা আবর্জনা সরিয়ে ফেলার মতো শক্তিশালী অভিকর্ষজ ক্ষমতা রাখতে হবে।
এই শেষ শর্তটি পূরণ করতে না পারায় ২০০৬ সালে প্লুটো তার 'গ্রহ' মর্যাদা হারায় এবং তাকে 'বামন গ্রহ' হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়।

গ্রহের উৎপত্তি: নীহারিকা মতবাদ (Nebular Hypothesis)

একটি গ্রহ কীভাবে জন্ম নেয়? বিজ্ঞানীদের মতে, গ্রহ সৃষ্টির রহস্য লুকিয়ে আছে নীহারিকা মতবাদ বা Nebular Hypothesis-এর মধ্যে। প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর আগে মহাকাশে গ্যাস এবং ধূলিকণার এক বিশাল মেঘ (Nebula) সংকুচিত হতে শুরু করে।
সংকোচন: মহাকর্ষ বলের প্রভাবে এই মেঘের কেন্দ্রবিন্দুতে ভর বাড়তে থাকে, যা পরবর্তীতে নক্ষত্র বা সূর্যের জন্ম দেয়।
ডিস্ক গঠন: অবশিষ্ট ধূলিকণা এবং গ্যাস সূর্যের চারদিকে একটি চ্যাপ্টা থালার মতো ঘুরতে থাকে।
অ্যাক্রিশন (Accretion): ছোট ছোট ধূলিকণা একে অপরের সাথে সংঘর্ষের ফলে জমাট বেঁধে বড় আকার ধারণ করে। এভাবেই পর্যায়ক্রমে গ্রহাণু এবং শেষ পর্যন্ত গ্রহের সৃষ্টি হয়।

টেরেস্ট্রিয়াল বা পার্থিব গ্রহ (Terrestrial Planets)

সৌরজগতের সূর্য থেকে সবচেয়ে কাছের চারটি গ্রহকে বলা হয় পার্থিব গ্রহ। এগুলো হলো বুধ, শুক্র, পৃথিবী এবং মঙ্গল।
গঠন: এই গ্রহগুলো মূলত পাথর এবং ধাতু দিয়ে তৈরি। এদের পৃষ্ঠ কঠিন এবং সুনির্দিষ্ট।
আকার: গ্যাস দানবদের তুলনায় এরা আকারে ছোট।
বৈশিষ্ট্য: এদের বায়ুমণ্ডল তুলনামূলক পাতলা (শুক্র বাদে) এবং এদের উপগ্রহের সংখ্যা খুবই কম। পৃথিবী এই শ্রেণির একমাত্র গ্রহ যেখানে তরল পানি ও প্রাণের অস্তিত্ব আছে।

গ্যাস জায়ান্টের ছবি
গ্যাস জায়ান্ট

গ্যাস জায়ান্ট এবং আইস জায়ান্ট (Gas and Ice Giants)

মঙ্গল গ্রহের সীমানা পেরিয়ে গেলে আমরা দেখা পাই বিশালকার গ্রহদের। এদের দুই ভাগে ভাগ করা হয়-

গ্যাস জায়ান্ট (বৃহস্পতি ও শনি)
এরা মূলত হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম গ্যাস দিয়ে গঠিত। এদের কোনো কঠিন পৃষ্ঠ নেই। আপনি যদি বৃহস্পতিতে নামার চেষ্টা করেন, তবে আপনি কেবল গ্যাসের স্তরের গভীরে ডুব দিতে থাকবেন।
আইস জায়ান্ট (ইউরেনাস ও নেপচুন)
এরা সূর্য থেকে অনেক দূরে অবস্থিত হওয়ায় অত্যন্ত শীতল। এদের গভীরে পানি, মিথেন এবং অ্যামোনিয়ার বরফ মিশ্রিত একটি আবরণ থাকে। এদের নীল রঙের প্রধান কারণ হলো বায়ুমণ্ডলে থাকা মিথেন গ্যাস।

বামন গ্রহ (Dwarf Planets)

যেসব বস্তু গ্রহের প্রথম দুটি শর্ত পূরণ করলেও কক্ষপথ পরিষ্কার করার ক্ষমতা রাখে না, তাদের বামন গ্রহ বলা হয়। আমাদের সৌরজগতে পরিচিত কিছু বামন গ্রহ হলো:
প্লুটো: একসময়ের নবম গ্রহ।
সেরেস: গ্রহাণু বেল্টে অবস্থিত।
এরিস ও হাউমেয়া: সৌরজগতের দূরবর্তী প্রান্তে এদের অবস্থান।

গ্রহের বায়ুমণ্ডল ও তার গুরুত্ব

বায়ুমণ্ডল হলো গ্রহের চারদিকে ঘিরে থাকা গ্যাসের স্তর। এটি একটি সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।
তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ: বায়ুমণ্ডল সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি আটকায় এবং গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে তাপমাত্রা বজায় রাখে।
সুরক্ষা: মহাকাশ থেকে আসা উল্কাপিন্ড বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করলে ঘর্ষণের ফলে পুড়ে ছাই হয়ে যায়, ফলে গ্রহের পৃষ্ঠ রক্ষা পায়।

চৌম্বক ক্ষেত্র এবং এর সুরক্ষা

পৃথিবীর মতো অনেক গ্রহের কেন্দ্রে গলিত লোহা থাকে, যা একটি শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র (Magnetic Field) তৈরি করে। এই ক্ষেত্রটি সূর্য থেকে আসা ক্ষতিকর সৌর বায়ু (Solar Wind) থেকে আমাদের রক্ষা করে। যদি চৌম্বক ক্ষেত্র না থাকত, তবে বায়ুমণ্ডল মহাকাশে হারিয়ে যেত এবং জীবন অসম্ভব হয়ে পড়ত।

উপগ্রহ এবং বলয় ব্যবস্থা

প্রায় প্রতিটি বড় গ্রহের নিজস্ব সঙ্গী বা উপগ্রহ থাকে। পৃথিবীর একটি চাঁদ থাকলেও বৃহস্পতির ৯৫টির বেশি উপগ্রহ রয়েছে। এছাড়া শনি গ্রহের চারদিকে বরফ ও পাথরের তৈরি আকর্ষণীয় বলয় বা Rings দেখা যায়। যদিও বৃহস্পতি, ইউরেনাস এবং নেপচুনেরও বলয় আছে, কিন্তু সেগুলো শনির মতো অতটা স্পষ্ট নয়।

এক্সোপ্ল্যানেট (Exoplanets): সৌরজগতের বাইরের জগত

আমাদের সৌরজগতের বাইরে অন্য কোনো নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে যে গ্রহগুলো ঘোরে, তাদের বলা হয় এক্সোপ্ল্যানেট। ১৯৯০-এর দশকের আগে আমরা এদের অস্তিত্ব নিশ্চিতভাবে জানতাম না। বর্তমানে হাজার হাজার এক্সোপ্ল্যানেট আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে কিছু গ্রহ পৃথিবীর মতোই পাথুরে এবং সেখানে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

গ্রহের কক্ষপথ এবং আবর্তন গতি

প্রতিটি গ্রহের দুটি প্রধান গতি থাকে-
আবর্তন (Rotation): নিজের অক্ষের ওপর ঘোরা। এর ফলে দিন ও রাত হয়।
পরিক্রমণ (Revolution): নক্ষত্রের চারদিকে নির্দিষ্ট পথে ঘোরা। একে বলা হয় কক্ষপথ (Orbit)। এই গতির কারণে গ্রহগুলোতে ঋতু পরিবর্তন হয়।

গ্রহ এবং প্রাণের সম্ভাবনা (Habitability)

বিজ্ঞানিরা মহাকাশে প্রাণের সন্ধানে মূলত 'গোল্ডিলকস জোন' (Goldilocks Zone) বা বাসযোগ্য অঞ্চল খোঁজেন। এটি নক্ষত্র থেকে এমন এক দূরত্ব, যেখানে তাপমাত্রা খুব বেশিও নয় আবার খুব কমও নয়। এই অঞ্চলে পানি তরল অবস্থায় থাকতে পারে, যা প্রাণের বিকাশের জন্য অপরিহার্য।

গ্রহ গবেষণার ভবিষ্যৎ: মহাকাশ অভিযান

মানুষ এখন কেবল দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে গ্রহ দেখেই ক্ষান্ত নয়। আমরা মঙ্গল গ্রহে রোভার পাঠিয়েছি, বৃহস্পতির উপগ্রহে প্রাণের খোঁজ করছি এবং জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে সুদূর কক্ষপথের গ্রহগুলোর বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ করছি। ভবিষ্যতে মানুষ হয়তো মঙ্গলে বসতি গড়বে বা অন্য কোনো নক্ষত্রমন্ডলীতে প্রাণের সংকেত খুঁজে পাবে।

পৃথিবী ও উপগ্রহ
ছবি: পৃথিবী ও উপগ্রহ

গ্রহগুলো কেবল মহাকাশের জড় বস্তু নয়; বরং এগুলো হলো এক একটি বিশাল গবেষণাগার যেখানে মহাবিশ্বের ইতিহাস লেখা আছে। পৃথিবী আমাদের একমাত্র ঘর হলেও, অন্যান্য গ্রহগুলো আমাদের শেখায় মহাবিশ্ব কতটা বৈচিত্র্যময় এবং বিশাল। গ্রহ সম্পর্কে আমাদের এই জ্ঞান প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে হয়তো আমাদের অন্য কোনো জগতের নাগাল পেতে সাহায্য করবে।

মহাকাশ বিজ্ঞানের এই অগ্রযাত্রা প্রমাণ করে যে, মানুষের অজানাকে জানার তৃষ্ণা চিরকালই অমলিন থাকবে।

তথ্য সূত্রঃ  উইকিপিডিয়া

আরো পড়ুনঃ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!