চাঁদ কি? পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ চাঁদের অজানা তথ্য ও রহস্য

Zamil Islam
0

চাঁদ কি? পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ চাঁদ সম্পর্কে অজানা যতো তথ্য ও রহস্য


রাতের স্তব্ধতায় আকাশের দিকে তাকালে যে মায়াবী উজ্জ্বল গোলোকটি আমাদের নজর কাড়ে, সেটিই হলো আমাদের চিরচেনা ও চিরপরিচিত চাঁদ মামা। কিন্তু আমাদের মনের গহীনে কখনো কি এই প্রশ্নটা জাগে যে— চাঁদ আসলে কি? এটি কি কেবলই একটি পাথুরে গোলক। নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের ইতিহাস? মানবসভ্যতার আদিকাল থেকে চাঁদকে নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। আর ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে তো চাঁঁদ মামাকে নিয়ে রয়েছে হাজারও কৌতুহল। ছোটবেলা থেকেই যখন রাতের আকাশে চাঁদ মামাকে দেখেছি, তখন থেকেই এই চাঁদের প্রতি আমার রয়েছে এক তীব্র কৌতুহল।

what is moon, moon photo
আকাশে চাঁদের দৃশ্য


চাঁদ কখনো হয় কবিদের কাছে তাদের কবিতার উপমা, আবার কখনো কখনো বিজ্ঞানীদের গবেষণার মূল কেন্দ্রবিন্দু। আধুনিকতার এই যুগে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায়, পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ হলো আমাদের চাঁদ। যা পৃথিবীকে কেন্দ্র করে তার নির্দিষ্ট কক্ষপথে আবর্তন করে চলেছে। এটি সৌরজগতের পঞ্চম বৃহত্তম উপগ্রহ এবং এর উপস্থিতির কারণেই পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব রক্ষা করা ও ঋতুচক্র বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে। আজকের এই বিস্তারিত নিবন্ধে আমরা মহাজাগতিক দৃষ্টিকোণ থেকে জানার চেষ্টা করবো যে, আসলে চাঁদ কি এবং এর প্রভাব আমাদের জীবনে ও বিজ্ঞানে ঠিক কতটা গভীর।

চাঁদের উৎপত্তি ও গঠনতত্ত্ব: একটি মহাজাগতিক সংঘর্ষের ফল

চাঁদ কি এবং এটি কিভাবে তৈরি হলো, এই বিষয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক বিবাদ ছিলো। তবে বর্তমানে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মতবাদ হলো 'জায়ান্ট ইমপ্যাক্ট হাইপোথিসিস' বা বিশাল সংঘর্ষ তত্ত্ব। আজ থেকে প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী যখন গঠিত হচ্ছিলো, তখন মঙ্গল গ্রহের সমান “থিয়া” নামক একটি বিশাল মহাজাগতিক বস্তু পৃথিবীর সাথে সজোরে ধাক্কা খায় বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন। প্রলয়ঙ্করী সেই সংঘর্ষের ফলে পৃথিবী থেকে বিশাল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ পুরো মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। মাধ্যাকর্ষণ বলের প্রভাবে সেই উত্তপ্ত ধূলিকণা ও পাথর একত্রিত হয়ে আজকে আমাদের এই চাঁদে রূপান্তরিত হয়েছে।

পৃথিবীর মতোই চাঁদের গঠনও বিভিন্ন স্তরবিশিষ্ট। চাঁদের অভ্যন্তরে অর্থাৎ কেন্দ্রে একটি ছোট লোহার কোর রয়েছে। তার উপরে ম্যান্টল এবং সবার বাইরে রয়েছে কঠিন ক্রাস্ট বা ভূত্বক। চাঁদের পৃষ্ঠ মূলত সিলিকেট পাথর ও বিভিন্ন ধাতব খনিজের সমন্বয়ে গঠিত। বায়ুমণ্ডল না থাকায় চাঁদের পৃষ্ঠের সুরক্ষার জন্য কোনো স্তর নেই। যার ফলে উল্কাপাতের চিহ্নগুলো কোটি কোটি বছর ধরে অক্ষত অবস্থায় রয়ে গেছে।

চাঁদের পর্যায়সমূহ এবং দৃশ্যমান পরিবর্তন

প্রতিদিন চাঁদকে আমরা আকাশে একই রূপে দেখি না। কখনো এটি কাস্তের মতো সরু। আবার কখনো থালা কিংবা ফুটবলের মতো গোল। এই পরিবর্তন দেখে আমাদের মনে হতে পারে চাঁদ কি তার আকার পরিবর্তন করছে? আসলে বিষয়টি তা নয়। চাঁদ পৃথিবীকে যখন প্রদক্ষিণ করে, তখন সূর্যের আলো চাঁদের যতটুকু অংশে পড়ে এবং আমরা পৃথিবী থেকে যতোটুকু দেখতে পাই, তার ওপর ভিত্তি করেই চাঁদের এই রূপভেদ তৈরি হয়। একেই চাঁদের কলা বা 'Lunar Phases' বলা হয়।

চাঁদের এই চক্রটি সম্পন্ন হতে প্রায় ২৯.৫ দিন সময় লাগে। অমাবস্যা থেকে শুরু করে পূর্ণিমা এবং পুনরায় অমাবস্যা পর্যন্ত এই চক্র চলতে থাকে। চাঁদ যখন সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে থাকে, তখন আমরা এর আলোকিত অংশ দেখতে পাই না। একে তখন অমাবস্যা বলা হয়। আবার পৃথিবী যখন সূর্য ও চাঁদের মাঝে থাকে, তখন চাঁদের পুরো আলোকিত অংশ আমাদের সামনে দৃশ্যমান হয়, যাকে আমরা পূর্ণিমা বলি। এই পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনগুলোই পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটা এবং পঞ্জিকা গণনার মূল ভিত্তি।

পৃথিবীর ওপর চাঁদের প্রভাব: জোয়ার-ভাটা ও ভারসাম্য


পৃথিবীর প্রাণের অস্তিত্ব রক্ষায় চাঁদ কি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে? উত্তরটি হলো—অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চাঁদের নিজস্ব মহাকর্ষ বল পৃথিবীর সমুদ্রের পানিকে নিজের দিকে টানে, যার ফলে নদী কিংবা সমুদ্রে জোয়ার ও ভাটার সৃষ্টি হয়। এই জোয়ার-ভাটা সমুদ্রের বাস্তুসংস্থান রক্ষা এবং পুষ্টি উপাদান ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে।

শুধু তাই নয়, চাঁদ পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষকে নির্দিষ্ট কোণে (২৩.৫ ডিগ্রি) স্থির রাখতে সাহায্য করে। চাঁদ যদি না থাকতো, তবে পৃথিবী টালমাটাল অবস্থায় থাকতো। যার ফলে জলবায়ুর চরম বিপর্যয় ঘটতো। পৃথিবীতে নির্দিষ্ট কোনো ঋতুচক্র থাকতো না। চাঁদের স্থিতিশীল প্রভাবের কারণেই আজ আমরা পৃথিবীতে বাসযোগ্য আবহাওয়া পাচ্ছি। এছাড়া চাঁদের আকর্ষণ বল পৃথিবীর ঘূর্ণন গতিকে কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে। যা দিন ও রাতের দৈর্ঘ্যকে স্থিতিশীল করে।

chad ki
চাঁদের মাটির দৃশ্য

চাঁদের অন্ধকার দিক ও অজানা রহস্যসমূহ

অনেকের মনেই কৌতূহল থাকে যে চাঁদের কি কোনো অন্ধকার দিক আছে? মূলত চাঁদের একটি পৃষ্ঠ সবসময় পৃথিবীর দিকে মুখ করে থাকে। একে বলা হয় 'Tidal Locking'। এর ফলে আমরা পৃথিবী থেকে চাঁদের কেবল একটি পাশই (Near Side) দেখতে পাই। অন্য পাশটি অর্থাৎ 'Far Side' আমাদের দৃষ্টির আড়ালে থাকে। দীর্ঘকাল একে 'অন্ধকার দিক' বলা হলেও আসলে সূর্যের আলো সেখানেও পৌঁছায়।

তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন অর্থাৎ বর্তমান রাশিয়ার লুনা-৩ মহাকাশযান সর্বপ্রথম চাঁদের সেই অদেখা অংশের ছবি তুলেছিলো। সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় হলো, আমরা চাঁদের যে পাশটি সবসময় দেখি, তার তুলনায় পেছনের অংশটি অনেক বেশি রুক্ষ। আর তাছাড়া সেখানে পাহাড়-পর্বত ও গর্তের সংখ্যা অনেক বেশি। বিজ্ঞানীরা এখনো গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন যে, কেনো চাঁদের দুই পৃষ্ঠের মধ্যে এতো বৈসাদৃশ্য রয়েছে। এই রহস্যময় দিকটি উন্মোচনের জন্য বর্তমান সময়ে বিভিন্ন দেশ দক্ষিণ মেরুতে অভিযান পরিচালনা করছে।

মানব অভিযানে চাঁদ: অ্যাপোলো থেকে বর্তমান প্রেক্ষাপট

চাঁদ কি কেবল দূরবীন দিয়ে দেখার বস্তু?
মানব জাতি সেই ধারণা বদলে দেয় ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই। পৃথিবী থেকে প্রথমবারের মতো নীল আর্মস্ট্রং এবং এডউইন অলড্রিন অ্যাপোলো-১১ মিশনের মাধ্যমে চাঁদের মাটিতে প্রথম পা রাখেন। এটি ছিলো মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক সাফল্য। এরপর থেকে বিভিন্ন সময় মানুষ চাঁদ থেকে মাটির নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে এসেছে। যা আমাদের সৌরজগতের ইতিহাস বুঝতে সাহায্য করেছে।

বর্তমানে নাসা (NASA) তাদের 'আর্টেমিস' মিশনের মাধ্যমে পুনরায় মানুষকে চাঁদে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এবার লক্ষ্য শুধু সফর নয়। বরং চাঁদে একটি স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি করা। এছাড়া চীন, রাশিয়া ও ভারতের মতো দেশগুলোও চাঁদে পানির অস্তিত্ব এবং খনিজ সম্পদের সন্ধানে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে বরফ আকারে পানির অস্তিত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা বিজ্ঞানীদের উৎসাহিত করেছে যে, ভবিষ্যতে এখানে মানুষের কলোনি স্থাপন করা সম্ভব হতে পারে।

আরো পড়ুনঃ চাঁদ কিভাবে তৈরি হয়েছে? চাঁদ সৃষ্টি হওয়ার পেছনের রহস্য

জোতির্বিজ্ঞানে চাঁদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব

মানুষের সংস্কৃতি ও ধর্মে চাঁদ কি বিশেষ কোনো স্থান দখল করে আছে? অবশ্যই। প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন সভ্যতা চাঁদকে তাদের দেবতা বা শক্তির প্রতীক হিসেবে পূজা করে আসছে। ইসলাম ধর্মে হিজরি ক্যালেন্ডার বা চান্দ্র মাসের হিসাব পুরোপুরি চাঁদের ওপর নির্ভরশীল। ঈদ, রমজান এবং অন্যান্য ধর্মীয় উৎসব নির্ধারণ করা হয় চাঁদের উদয় দেখে।

আবার সনাতন ধর্মে চন্দ্রকে একজন দেবতা হিসেবে গণ্য করা হয়। গ্রিক ও রোমান রূপকথাতেও চাঁদকে নিয়ে অজস্র কাহিনী রয়েছে। সাহিত্যিকদের কবিতায় চাঁদ বিরহ ও ভালোবাসার প্রতীক। অর্থাৎ বিজ্ঞান ছাপিয়ে চাঁদ আমাদের মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক জগতের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চাঁদের ভবিষ্যৎ এবং মহাকাশ গবেষণার নতুন দিগন্ত

ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিতে চাঁদ কি আমাদের পরবর্তী গন্তব্য হতে যাচ্ছে? উত্তরটি বেশ ইতিবাচক। বিজ্ঞানীরা চাঁদকে মহাকাশ গবেষণার একটি 'লঞ্চপ্যাড' হিসেবে দেখছেন। পৃথিবী থেকে মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার চেয়ে চাঁদ থেকে যাওয়া অনেক বেশি সহজ ও সাশ্রয়ী। চাঁদে হিলিয়াম-৩ নামক একটি বিরল আইসোটোপের সন্ধান পাওয়া গেছে। যা ভবিষ্যতে পৃথিবীতে ক্লিন এনার্জি বা পারমাণবিক ফিউশন শক্তির প্রধান উৎস হতে পারে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন চাঁদে খনিজ সম্পদ আহরণ এবং পর্যটনের কথা ভাবছে। হয়তো আগামী কয়েক দশকের মধ্যে সাধারণ মানুষও চাঁদে ভ্রমণের সুযোগ পাবে। তবে এই মহাজাগতিক সম্পদের ব্যবহার যেনো সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ হয়। সেটাই এখন বিশ্ববাসীর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।


চাঁদের উৎপত্তি
রাতে চাঁদের দৃশ্য


পরিশেষে বলা যায়, চাঁদ কি—এই প্রশ্নের উত্তর কেবল মাত্র একটি বাক্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আমাদের অস্তিত্বের রক্ষক, বিজ্ঞানের রহস্যভাণ্ডার এবং আমাদের কল্পনার এক বিশাল আকাশ। মামারা যেমন আমাদের কাছে ভালোবাসার জায়গা। ঠিক তেমনিভাবে চাঁদ মামাও আমাদের কাছে এক পরম মমতা ও ভালোবাসার এক বস্তু। কারণ চাঁদ কিন্তু মামার মতোই আমাদেরকে পৃথিবীর পরম বন্ধু হিসেবে কোটি কোটি বছর ধরে ছায়া দিয়ে আসছে। এর ধূলিময় ধূসর পৃষ্ঠে লুকিয়ে আছে পৃথিবীর জন্মের প্রাচীন ইতিহাস। আমরা যতো বেশি চাঁদকে জানবো,আমরা ততো বেশি আমাদের এই মহাবিশ্ব এবং নিজেদের উৎপত্তি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাবো। আমি সবসময়ই চাই, চাঁদের আলোয় আলোকিত হোক আমাদের জ্ঞানের জগৎ। আর প্রতিনিয়ত উন্মোচিত হোক মহাকাশের আরও নতুন নতুন রহস্যের দিগন্ত।


আরো পড়ুনঃ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!