![]() |
| ziodop.com |
মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়: বিগ ব্যাং থিওরি ও সৃষ্টির রহস্য
মহাবিশ্বের শুরুটা ঠিক কেমন ছিলো?
আমরা যে বিশাল মহাবিশ্বে বাস করি, এর শুরুটা কিভাবে হয়েছিলো? এই প্রশ্নটি মানুষকে হাজার বছর ধরে ভাবিয়ে আসছে। আধুনিক বিজ্ঞানের কাছে এর সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য এবং রোমাঞ্চকর উত্তর হলো বিগ ব্যাং থিওরি। সহজ কথায় বলতে গেলে, এই তত্ত্ব অনুযায়ী আজ থেকে প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে আমাদের এই মহাবিশ্ব একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র, প্রচণ্ড ঘন এবং উত্তপ্ত বিন্দু থেকে যাত্রা শুরু করেছিলো।
অনেকের মনে হতে পারে, ‘বিগ ব্যাং’ মানে বিশাল কোনো বিস্ফোরণ। কিন্তু আসলে এটি ছিলো মহাকাশ বা স্পেসের অত্যন্ত দ্রুতগতির এক প্রসারণ। যা আজও থেমে নেই। যা সৃষ্টির সেই সূচনালগ্ন থেকে আজ অব্দি নিরন্তর বয়ে চলেছে।
কিভাবে এলো বিগ ব্যাং থিওরির এই ধারণা?
বিগ ব্যাং-এর ধারণাটি কোনো একক বিজ্ঞানীর মস্তিষ্কপ্রসূত নয়। বরং এটি দশকের পর দশক ধরে চলা বিজ্ঞানীদের গবেষণার ফল।১৯২০-এর দশকে জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাবল লক্ষ্য করেন যে, দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো আমাদের থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। তখন বিজ্ঞানীরা ভাবলেন, গ্যালাক্সিগুলো যদি এখন দূরে সরে যায়, তবে অতীতে নিশ্চয়ই সেগুলো একে অপরের খুব কাছে ছিলো।
এই সহজ চিন্তা থেকেই বিজ্ঞানীদের মনে জন্ম নিলো এক বৈপ্লবিক ধারণা। তারা ভাবলো সব কিছুই এক সময় একটি বিন্দুতে সীমাবদ্ধ ছিলো।
মহাবিশ্বের বিবর্তনের গল্প-
মহাবিশ্বের জন্মমুহূর্ত থেকে বর্তমান পর্যন্ত সময়কালকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে ভাগ করা যায়:প্ল্যাঙ্ক যুগ: মহাবিশ্বের একদম শুরুর মুহূর্ত। এই সময়ে তাপ ও ঘনত্ব এতো বেশি ছিলো যে পদার্থবিজ্ঞানের সাধারণ নিয়মগুলো সেখানে খাটত না।
ইনফ্লেশন বা মহাপ্রসারণ: এক সেকেন্ডের কোটি কোটি ভাগের এক ভাগ সময়ের মধ্যে মহাবিশ্ব কল্পনাতীত দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ে।
কণার মেলা: তাপমাত্রা সামান্য কমলে সৃষ্টি হয় প্রোটন, নিউট্রন ও ইলেকট্রনের মতো মৌলিক কণা।
প্রথম মৌলের জন্ম: কয়েক মিনিটের মাথায় তৈরি হয় হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের মতো হালকা গ্যাস।
আলোর দেখা: প্রায় ৩,৮০,০০০ বছর পর মহাবিশ্ব কিছুটা ঠান্ডা হলে আলো মুক্তভাবে চলাচল করার সুযোগ পায়।
নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি: কয়েক কোটি বছর পর মহাকর্ষ বলের প্রভাবে ধূলিকণা ও গ্যাস একত্রিত হয়ে জন্ম দেয় নক্ষত্র, গ্রহ এবং আমাদের ছায়াপথ।
রেড শিফট (Redshift): গ্যালাক্সিগুলো থেকে আসা আলোর বর্ণালীতে লাল রঙের আধিক্য প্রমাণ করে যে মহাবিশ্ব বেলুনের মতো ফুলে ফেঁপে বড় হচ্ছে।
মহাজাগতিক বিকিরণ (CMB): পুরো মহাবিশ্ব জুড়ে এক ধরণের প্রাচীন তাপের রেশ বা সংকেত পাওয়া যায়। যা সেই আদিম মহাবিস্ফোরণেরই 'প্রতিধ্বনি'।
গ্যাসের অনুপাত: মহাবিশ্বে হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের যে পরিমাণ আমরা দেখি, তা বিগ ব্যাং মডেলের হিসাবের সাথে হুবহু মিলে যায়।
বিগ ব্যাং কি আসলেও সত্যি? এর প্রমাণ কী?
বিজ্ঞানীরা শুধু অনুমানের ওপর ভিত্তি করে এটি বলেন না, এর পেছনে রয়েছে শক্ত কিছু প্রমাণ:রেড শিফট (Redshift): গ্যালাক্সিগুলো থেকে আসা আলোর বর্ণালীতে লাল রঙের আধিক্য প্রমাণ করে যে মহাবিশ্ব বেলুনের মতো ফুলে ফেঁপে বড় হচ্ছে।
মহাজাগতিক বিকিরণ (CMB): পুরো মহাবিশ্ব জুড়ে এক ধরণের প্রাচীন তাপের রেশ বা সংকেত পাওয়া যায়। যা সেই আদিম মহাবিস্ফোরণেরই 'প্রতিধ্বনি'।
গ্যাসের অনুপাত: মহাবিশ্বে হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের যে পরিমাণ আমরা দেখি, তা বিগ ব্যাং মডেলের হিসাবের সাথে হুবহু মিলে যায়।
বিগ ব্যাং-এর আগে কি ছিলো?
এটি বিজ্ঞানের জগতের সবচেয়ে বড় রহস্য। যেহেতু সময় ও স্থানের (Time and Space) জন্মই হয়েছে বিগ ব্যাং-এর মাধ্যমে। তাই এর ‘আগে’ বলতে কিছু ছিল কি না, তা নিয়ে বেশ বিতর্ক আছে। কেউ বলেন এর আগে শুধুই শূন্যতা ছিলো। আবার কেউ মনে করেন আমাদের মহাবিশ্ব অন্য কোনো মহাবিশ্বের অংশ হিসেবে জন্মেছে। তবে সত্যিটা হলো, আমরা এখনো নিশ্চিত নই।মহাবিশ্বের শেষ পরিণতি কী?
বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনটি রোমাঞ্চকর সম্ভাবনা দেখছেন। আর তা হলো-বিগ ফ্রিজ (Big Freeze): মহাবিশ্ব ক্রমাগত প্রসারিত হতে হতে একসময় সব নক্ষত্র নিভে যাবে। তখন সবকিছু হিমাঙ্কে পৌঁছে নিথর হয়ে যাবে। বর্তমানে এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী ধারণা।
বিগ ক্রাঞ্চ (Big Crunch): প্রসারণ থেমে গিয়ে মহাবিশ্ব আবার সংকুচিত হতে শুরু করবে। এটি
শুরুতে যেমন ছিলো তেমনি এক বিন্দুতে মিলিয়ে যাবে।
বিগ রিপ (Big Rip): প্রসারণের গতি এতো বেড়ে যাবে যে গ্যালাক্সি, নক্ষত্র এমনকি পরমাণুও ছিঁড়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
শেষ কথা-
বিগ ব্যাং থিওরি হয়তো আমাদের সব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর নয়। কিন্তু এটি আমাদের অস্তিত্বের শিকড় খোঁজার পথে সবচেয়ে বড় আলো। বিজ্ঞান প্রতিনিয়ত এগিয়ে চলছে। আর প্রতিটি নতুন আবিষ্কার আমাদের মহাবিশ্বের এই আদি রহস্যের আরও গভীরে নিয়ে যাচ্ছে। হয়তো কোনো একদিন আমরা ঠিকঠাক জানতে পারবো যে, শূন্য থেকে কীভাবে সৃষ্টি হলো এই অসীম সুন্দর মহাবিশ্ব!তথ্য সূত্রঃ উইকিপিডিয়া

