মহাকাশে শব্দ শোনা যায় না কেন?
মহাকাশের কথা ভাবলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে অসীম অন্ধকারে ছড়িয়ে থাকা তারা, গ্রহ আর রহস্যময় গ্যালাক্সির ছবি। ছোটবেলা থেকেই আমরা সিনেমা, কার্টুন কিংবা বিজ্ঞান কল্পকাহিনীতে মহাকাশকে নানা রকম বিস্ফোরণ আর তীব্র শব্দে ভরা একটি জায়গা হিসেবে দেখে অভ্যস্ত। বিশাল মহাকাশযান ছুটে যাচ্ছে, কোথাও গ্রহাণুর সংঘর্ষ হচ্ছে, আবার কোথাও ভয়ংকর বিস্ফোরণ—সবকিছুর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় নাটকীয় শব্দ। কিন্তু বাস্তবের মহাকাশ আসলে একেবারেই ভিন্ন। বাস্তবে মহাকাশ প্রায় সম্পূর্ণ নীরব।শুনতে একটু অদ্ভুত লাগলেও সত্যি হলো, মহাকাশে আপনি চিৎকার করলেও পাশে থাকা কেউ তা শুনতে পাবে না। কারণ শব্দ ছড়িয়ে পড়ার জন্য যে পরিবেশ দরকার, মহাকাশে সেটাই নেই। পৃথিবীতে আমরা যেভাবে শব্দ শুনি, মহাশূন্যে সেই নিয়ম কাজ করে না। আর এই কারণেই বিজ্ঞানীরা মহাকাশকে প্রায়ই “নীরব জগৎ” বলে থাকেন। এই নীরবতার পেছনে রয়েছে দারুণ কিছু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। শব্দ কীভাবে তৈরি হয়, কীভাবে চলাচল করে এবং কেন মহাকাশে গিয়ে থেমে যায়—এসব বিষয় জানলে পুরো ব্যাপারটি অনেক বেশি মজার মনে হবে। চলুন তাহলে ধাপে ধাপে জেনে নেওয়া যাক, কেন মহাকাশে শব্দ শোনা যায় না।
![]() |
| শূন্যস্তানে পৃথিবী |
মাধ্যমের অনুপস্থিতি
আমরা পৃথিবীতে যেসব শব্দ শুনি, সেগুলোর প্রতিটির পেছনেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কাজ করে—মাধ্যম। শব্দ কখনো একা চলতে পারে না। এটি চলার জন্য বায়ু, পানি কিংবা কোনো কঠিন বস্তুর মতো মাধ্যমের প্রয়োজন হয়। ধরুন, আপনি কথা বলছেন। আপনার কণ্ঠনালির কম্পন আশপাশের বায়ুকে কাঁপায়। সেই কম্পন এক বায়ুকণা থেকে আরেক বায়ুকণায় ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত অন্য মানুষের কানে পৌঁছায়। তখনই সে আপনার কথা শুনতে পায়।কিন্তু মহাকাশের পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে প্রায় কোনো বায়ু নেই। অর্থাৎ শব্দকে বহন করার মতো কার্যকর কোনো মাধ্যমই নেই। ফলে শব্দ তৈরি হলেও সেটি দূরে যেতে পারে না। বিষয়টা অনেকটা এমন যে আপনি যদি পানির মধ্যে ঢেউ তৈরি করেন, তাহলে ঢেউ ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু পানি না থাকলে ঢেউও থাকবে না। মহাকাশে শব্দের অবস্থাও ঠিক এমনই। এ কারণেই মহাকাশে যদি দুটি মহাকাশযান পাশাপাশি থাকে এবং একটিতে বিস্ফোরণ ঘটে, অন্য মহাকাশযানের মানুষ সেই শব্দ শুনতে পাবে না। কারণ মাঝখানে শব্দ পরিবহনের জন্য কোনো মাধ্যম নেই।
অণুর ঘনত্বের অভাব
শুধু মাধ্যম থাকলেই শব্দ চলতে পারে না, সেই মাধ্যমে পর্যাপ্ত অণুও থাকতে হয়। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অসংখ্য গ্যাসীয় অণু ঘনভাবে ছড়িয়ে আছে। এসব অণু খুব দ্রুত কম্পন আদান-প্রদান করতে পারে, তাই শব্দ সহজে চলাচল করে। মহাকাশে এই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো। সেখানে অণুর সংখ্যা এত কম যে বিশাল দূরত্বজুড়ে হয়তো হাতে গোনা কয়েকটি কণাই পাওয়া যায়। ফলে শব্দের কম্পন এক কণা থেকে আরেক কণায় পৌঁছাতে পারে না।একটি সহজ উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। ধরুন, কয়েকজন মানুষ কাছাকাছি দাঁড়িয়ে একে অপরের কাছে বল ছুড়ে দিচ্ছে। তাহলে বল সহজেই পৌঁছে যাবে। কিন্তু যদি সবাই কয়েক কিলোমিটার দূরে দাঁড়ায়, তাহলে বল আদান-প্রদান প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে। মহাকাশে শব্দের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। কণাগুলোর মধ্যে দূরত্ব এত বেশি যে শব্দের কম্পন ছড়িয়ে পড়ার আগেই হারিয়ে যায়। এই কারণেই মহাকাশকে এত নীরব মনে হয়। সেখানে শব্দের জন্য প্রয়োজনীয় “ভিড়” নেই বললেই চলে।
অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গের প্রকৃতি
শব্দ আসলে এক ধরনের অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ। শুনতে কঠিন লাগলেও বিষয়টি খুব সহজ। যখন কোনো শব্দ তৈরি হয়, তখন আশপাশের কণাগুলো সামনে-পেছনে কাঁপতে থাকে। এই কাঁপুনিই ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যায় এবং শব্দ তৈরি করে। ধরুন, আপনি একটি স্প্রিং চাপ দিলেন। চাপের ফলে স্প্রিংয়ের এক অংশ থেকে আরেক অংশে কম্পন ছড়িয়ে পড়বে। শব্দও ঠিক এভাবেই কাজ করে।পৃথিবীর বায়ুতে অসংখ্য কণা থাকায় এই কম্পন খুব সহজে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু মহাকাশে পর্যাপ্ত কণা না থাকায় শব্দের সেই কম্পন সামনে এগোতে পারে না। এখানেই শব্দ আর আলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য তৈরি হয়। আলো নিজের শক্তিতেই চলতে পারে, কিন্তু শব্দের চলার জন্য কণার সাহায্য লাগে। তাই মহাকাশে বড় কোনো বিস্ফোরণ ঘটলেও তার আলো দেখা সম্ভব, কিন্তু শব্দ শোনা সম্ভব নয়।
বায়ুমণ্ডলের অভাব
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল শুধু আমাদের শ্বাস নেওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, শব্দ শোনার জন্যও এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আমাদের চারপাশের বাতাসই শব্দকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পৌঁছে দেয়।যখন কেউ কথা বলে, তখন বায়ুর মধ্যে ছোট ছোট কম্পন তৈরি হয়। এই কম্পন আমাদের কানে পৌঁছায় বলেই আমরা শব্দ শুনতে পাই।
কিন্তু মহাকাশে কার্যকর কোনো বায়ুমণ্ডল নেই। ফলে সেখানে শব্দ পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসও নেই। এ কারণেই মহাশূন্য এত শান্ত ও নীরব। তবে কিছু গ্রহে ঘন বায়ুমণ্ডল রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে Venus গ্রহের কথা বলা যায়। সেখানে গ্যাসের পরিমাণ অনেক বেশি, তাই শব্দ চলাচল করতে পারে। কিন্তু উন্মুক্ত মহাশূন্যে এই সুবিধা নেই। এই কারণেই মহাকাশচারীরা যখন মহাকাশযানের বাইরে যান, তখন তারা বাইরের কোনো শব্দ শুনতে পান না।
শব্দ বনাম আলো
অনেকের মনেই প্রশ্ন আসে—যদি মহাকাশে শব্দ না চলে, তাহলে সূর্যের আলো পৃথিবীতে আসে কীভাবে? আসলে শব্দ আর আলো এক জিনিস নয়। শব্দ হলো যান্ত্রিক তরঙ্গ, আর আলো হলো তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ। শব্দ চলতে মাধ্যমের প্রয়োজন হয়, কিন্তু আলোর হয় না। তাই সূর্যের আলো অনায়াসে মহাকাশ পেরিয়ে পৃথিবীতে পৌঁছে যায়।সূর্যে প্রতিনিয়ত ভয়ংকর বিস্ফোরণ ঘটে। কিন্তু সেই বিস্ফোরণের শব্দ আমরা কখনো শুনতে পাই না। কারণ শব্দ মহাকাশের শূন্যতা অতিক্রম করতে পারে না। এই বিষয়টি অনেকটা এমন যে আপনি কাঁচের ওপাশে কাউকে দেখতে পাচ্ছেন, কিন্তু যদি শব্দ যাওয়ার পথ বন্ধ থাকে, তাহলে তার কথা শুনতে পারবেন না। মহাকাশের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটে। আমরা আলো দেখি, কিন্তু শব্দ শুনি না।
![]() |
| মহাকাশে নভচারী |
কানের পর্দার সীমাবদ্ধতা
আমাদের কান এমনভাবে তৈরি যে এটি মূলত বায়ুর কম্পন ধরতে পারে। কানের ভেতরে থাকা পাতলা পর্দাটি বায়ুর চাপের পরিবর্তনে কেঁপে ওঠে। এরপর সেই কম্পন মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায় এবং আমরা শব্দ অনুভব করি। কিন্তু মহাকাশে যেহেতু বায়ু নেই, তাই কানের পর্দাও কোনো কম্পন অনুভব করতে পারে না। ভাবুন তো, আপনি যদি সম্পূর্ণ শূন্য একটি ঘরে থাকেন যেখানে কোনো বাতাস নেই, তাহলে শব্দ কানে পৌঁছানোর সুযোগই থাকবে না। মহাকাশে পরিস্থিতি ঠিক এমনই। ফলে কেউ চিৎকার করলেও অন্য কেউ তা শুনতে পাবে না। এই কারণেই মানুষের স্বাভাবিক শ্রবণ ব্যবস্থা মহাকাশের জন্য কার্যকর নয়।মহাকাশযানের ভেতরকার পরিস্থিতি
তবে মজার বিষয় হলো, মহাকাশযানের ভেতরে কিন্তু শব্দ শোনা যায়। কারণ সেখানে কৃত্রিমভাবে বায়ু রাখা হয়, যাতে নভোচারীরা স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারেন। বায়ু থাকার কারণে মহাকাশযানের ভেতরে শব্দও চলাচল করতে পারে। নভোচারীরা সেখানে একে অপরের সঙ্গে কথা বলেন, যন্ত্রপাতির শব্দ শোনেন, এমনকি অ্যালার্মও শুনতে পান। International Space Station-এর ভেতরে সবসময় নানা যন্ত্রের মৃদু শব্দ শোনা যায়। ফ্যান, কম্পিউটার এবং লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম সবসময় চালু থাকে। কিন্তু মহাকাশযানের বাইরে বের হলেই চারপাশ আবার সম্পূর্ণ নীরব হয়ে যায়। এই বিষয়টি আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয়—শব্দের জন্য মাধ্যম কতটা গুরুত্বপূর্ণ।রেডিও তরঙ্গের ব্যবহার
মহাকাশে শব্দ চলতে না পারলেও যোগাযোগ থেমে থাকে না। নভোচারীরা যোগাযোগের জন্য রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করেন। রেডিও তরঙ্গও আলোর মতো তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ। তাই এটি শূন্যস্থান দিয়েও সহজে চলতে পারে। নভোচারীদের হেলমেটের ভেতরে থাকা মাইক্রোফোন তাদের কণ্ঠকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করে। এরপর সেই সংকেত রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে অন্য নভোচারী বা পৃথিবীতে পাঠানো হয়। এই প্রযুক্তির কারণেই মহাকাশ মিশন সফলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়। NASA এবং বিশ্বের অন্যান্য মহাকাশ সংস্থা প্রতিনিয়ত এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। রেডিও যোগাযোগ ছাড়া আধুনিক মহাকাশ অভিযান প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত।প্রচণ্ড বিস্ফোরণও নীরব
হলিউড সিনেমায় মহাকাশের বিস্ফোরণগুলো খুব নাটকীয়ভাবে দেখানো হয়। বিশাল শব্দ, গর্জন আর কম্পনে পুরো দৃশ্য কাঁপতে থাকে। কিন্তু বাস্তবে মহাকাশের বিস্ফোরণ সম্পূর্ণ নীরব। যদি কোনো মহাকাশযান বিস্ফোরিত হয়, তাহলে শুধু আলো দেখা যাবে। কিন্তু শব্দ শোনা যাবে না। কারণ শব্দ বহনের জন্য প্রয়োজনীয় বায়ু সেখানে নেই। সূর্যেও প্রতিনিয়ত বিশাল বিস্ফোরণ ঘটে। কিন্তু পৃথিবী থেকে আমরা সেগুলোর কোনো শব্দ শুনতে পাই না। এই নীরব বিস্ফোরণ মহাকাশকে আরও রহস্যময় করে তোলে। কারণ সেখানে ভয়ংকর ঘটনাও ঘটে সম্পূর্ণ নিঃশব্দে।শাব্দিক প্রতিবন্ধকতা
মহাকাশে শব্দ না পৌঁছানোর আরেকটি কারণ হলো শাব্দিক প্রতিবন্ধকতা। শব্দ চলার জন্য ধারাবাহিক কণার প্রয়োজন হয়। কিন্তু মহাকাশে সেই ধারাবাহিকতা নেই। ফলে শব্দ কিছুদূর যাওয়ার পরই দুর্বল হয়ে হারিয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা অবশ্য মহাকাশের বিভিন্ন তড়িৎচৌম্বক সংকেতকে বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে শব্দে রূপান্তর করেন। অনেক সময় আমরা “মহাকাশের শব্দ” নামে যেসব অডিও শুনি, সেগুলো আসলে প্রকৃত শব্দ নয়। এসব মূলত বৈজ্ঞানিক তথ্যকে মানুষের শোনার উপযোগী করে তৈরি করা হয়। অর্থাৎ বাস্তবে মহাকাশ এখনও আগের মতোই নীরব।![]() |
| তরঙ্গ ওয়েব |
মহাকাশে শব্দ শোনা যায় না, কারণ সেখানে শব্দ পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় মাধ্যম নেই। শব্দ হলো এমন এক তরঙ্গ যা চলার জন্য কণা বা অণুর সাহায্য চায়। কিন্তু মহাকাশ প্রায় সম্পূর্ণ শূন্য হওয়ায় শব্দ সেখানে ছড়িয়ে পড়তে পারে না। অন্যদিকে আলো এবং রেডিও তরঙ্গ শূন্যস্থান দিয়েও চলতে পারে। তাই আমরা সূর্যের আলো দেখতে পাই এবং নভোচারীরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
মহাকাশের এই নীরবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মহাবিশ্বের নিয়ম পৃথিবীর তুলনায় কতটা আলাদা এবং বিস্ময়কর। পরেরবার কোনো সিনেমায় মহাকাশে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনলে হয়তো আপনার মনে পড়বে—বাস্তব মহাকাশ আসলে ভয়ংকর রকমের নীরব।
তথ্য সূত্রঃ বিজ্ঞানী অর্গ
আরো পড়ুনঃ



