মহাবিশ্ব কি অসীম? এক মহাজাগতিক রহস্যের খোঁজে
মানুষ যখনই রাতের আকাশের দিকে তাকিয়েছে, তখনই এক অদ্ভুত বিস্ময় তাকে ঘিরে ধরেছে। ওই কালচে নীল ক্যানভাসে মিটমিট করে জ্বলা অজস্র তারা আর ছায়াপথ আমাদের মনে চিরন্তন এক প্রশ্ন জাগিয়ে দেয়—এই মহাবিশ্বের কি কোনো শেষ আছে? নাকি এটি এক অন্তহীন যাত্রা? শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানীরা এই ধাঁধার জট খোলার চেষ্টা করছেন। আইনস্টাইন থেকে হকিং, সবাই চেয়েছেন মহাবিশ্বের সীমানাটা ঠিক কোথায় তা বুঝে নিতে। আধুনিক প্রযুক্তি আর টেলিস্কোপ আমাদের অনেক তথ্য দিলেও, 'অসীমতা'র এই রহস্য আজও আমাদের ভাবিয়ে তোলে। আমরা কি সত্যিই এক অন্তহীন জগতে বাস করছি?![]() |
| অসীম মহাবিশ্ব |
অসীম বনাম সসীম
সাধারণভাবে 'অসীম' বলতে আমরা বুঝি এমন কিছু যার কোনো শেষ নেই। আর 'সসীম' মানে যার একটি নির্দিষ্ট আকার বা দেয়াল আছে। মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে অসীম হওয়ার মানে হলো, আপনি যদি আলোর গতিতেও অনন্তকাল ছুটতে থাকেন, তবুও কোনোদিন এর শেষ প্রান্তে পৌঁছাতে পারবেন না। তবে মজার ব্যাপার হলো, সসীম মানেই যে তার কোনো 'বর্ডার' বা 'প্রান্ত' থাকতে হবে, তা কিন্তু নয়। যেমন ধরুন পৃথিবীর পৃষ্ঠ; এটি সসীম, কিন্তু আপনি হাঁটতে হাঁটতে কোনোদিন পৃথিবীর শেষ প্রান্ত থেকে পড়ে যাবেন না, বরং ঘুরেফিরে আগের জায়গায় চলে আসবেন। মহাবিশ্বও হয়তো তেমনি এক ত্রিমাত্রিক বক্রতা, যা সসীম হয়েও প্রান্তহীন হতে পারে।আমাদের দৃষ্টির সীমা
আমরা টেলিস্কোপ দিয়ে মহাবিশ্বের যতটা অংশ দেখতে পাই, তাকে বলা হয় 'পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্ব'। এটি মূলত সেই অংশ যেখান থেকে আলো ১৩.৮ বিলিয়ন বছরে আমাদের পৃথিবীতে এসে পৌঁছাতে পেরেছে। বর্তমানে এই অঞ্চলের ব্যাস প্রায় ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ। তবে এই সংখ্যাটিই কিন্তু পুরো মহাবিশ্বের মাপ নয়। এর বাইরেও হয়তো এক বিশাল জগত রয়ে গেছে, যেখানকার আলো এখনো আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। এটি অনেকটা কুয়াশার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকার মতো—আমরা যতটুকু দেখতে পাচ্ছি তার বাইরেও পথ আছে, কিন্তু কুয়াশার কারণে তা আমাদের চোখের আড়ালে।আরো পড়ুনঃ ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি কি?
মহাবিশ্বের আকার
মহাবিশ্বের জ্যামিতিক আকারই ঠিক করে দেয় এটি অসীম কি না। বিজ্ঞানীরা মূলত তিন ধরনের আকারের কথা বলেন। এক, 'সমতল' (Flat) মহাবিশ্ব, যেখানে সমান্তরাল রেখাগুলো চিরকাল সমান্তরালই থাকে—এটি অসীম হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। দুই, 'বন্ধ' (Closed) মহাবিশ্ব, যা বলের মতো গোল এবং সসীম। তিন, 'উন্মুক্ত' (Open) মহাবিশ্ব, যা অনেকটা ঘোড়ার জিনের মতো বাঁকানো এবং অসীম। আধুনিক মহাকাশ গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, আমাদের মহাবিশ্ব প্রায় নিখুঁতভাবে 'সমতল'। আর গাণিতিকভাবে দেখলে, সমতল মহাবিশ্বের অসীম হওয়ার পাল্লাই সবচেয়ে ভারী।সিএমবি
মহাবিশ্বের আকার বুঝতে বিজ্ঞানীরা 'কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড' (CMB) বা মহাজাগতিক বিকিরণের সাহায্য নেন। এটি মূলত বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের পরবর্তী অবশিষ্টাংশ, যা পুরো মহাকাশে ছড়িয়ে আছে। এই বিকিরণের ধরণ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, মহাবিশ্বের বক্রতা প্রায় শূন্য। অর্থাৎ এটি চারদিকে অত্যন্ত সুষমভাবে বিস্তৃত। এই সিএমবি-র তথ্যই বিজ্ঞানীদের মনে জোরালো বিশ্বাস জন্ম দিয়েছে যে, আমরা সম্ভবত এক বিশাল অসীম ক্যানভাসের ক্ষুদ্র এক অংশে বাস করছি।দূরত্বের দৌড়
১৯২০-এর দশকে এডউইন হাবল আমাদের এক চমকপ্রদ তথ্য দেন—মহাবিশ্ব স্থির নয়, বরং এটি বড় হচ্ছে। দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো প্রতিনিয়ত আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। বেলুন ফোলালে যেমন তার গায়ের বিন্দুগুলো একে অপরের থেকে দূরে সরে যায়, মহাবিশ্বের প্রসারণও ঠিক তেমনি। যদি মহাবিশ্ব অসীম হয়, তবে এই প্রসারণ মানে হলো এর ভেতরে থাকা ফাঁকা জায়গা বা 'স্পেস' নিজেই বড় হচ্ছে। এই চলমান প্রসারণ অসীমতার ধারণাটিকে আরও রহস্যময় করে তোলে।![]() |
| টেলিস্কোপে মহাবিশ্বের বিশালতা |
প্রান্তহীনতা
মহাবিশ্বের কোনো 'বর্ডার' বা শেষ সীমানা আছে—এমন কোনো প্রমাণ আজ পর্যন্ত জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পাননি। বিজ্ঞানের 'কসমোলজিক্যাল প্রিন্সিপাল' অনুযায়ী, মহাবিশ্ব সব দিকেই প্রায় একই রকম। আপনি মহাবিশ্বের যেখানেই থাকুন না কেন, আপনার মনে হবে আপনিই কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন। যদি এর কোনো কিনারা থাকত, তবে সেখানকার পরিবেশ বা পদার্থবিদ্যার নিয়ম ভিন্ন হতো। কিন্তু আমরা সবদিকে একই রকম গ্যালাক্সির মেলা দেখি, যা মহাবিশ্বের প্রান্তহীনতা বা অসীম হওয়ার দিকেই ইঙ্গিত করে।ডার্ক এনার্জি
মহাবিশ্বের প্রসারণ কেবল চলছেই না, বরং দিন দিন এর গতি বাড়ছে। এর পেছনে দায়ী এক রহস্যময় শক্তি, যার নাম 'ডার্ক এনার্জি'। এটি অনেকটা মহাকর্ষের উল্টো কাজ করে—সবকিছুকে একে অপরের থেকে দূরে ঠেলে দেয়। ডার্ক এনার্জির প্রভাবে মহাবিশ্ব যদি চিরকাল এভাবে প্রসারিত হতে থাকে, তবে ভবিষ্যতে এটি এক বিশাল শূন্যতায় পরিণত হবে। এই অদ্ভুত শক্তির উপস্থিতি মহাবিশ্বের অসীম হওয়ার সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করে তুলেছে।মাল্টিভার্স
আধুনিক বিজ্ঞানের এক রোমাঞ্চকর তত্ত্ব হলো 'মাল্টিভার্স'। অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, আমাদের এই মহাবিশ্বই একমাত্র নয়, বরং সাবানের বুদবুদের মতো অসংখ্য মহাবিশ্ব থাকতে পারে। যদি মাল্টিভার্স তত্ত্ব সত্যি হয়, তবে অসীমতার ধারণাটি আমাদের কল্পনারও অতীত হয়ে দাঁড়াবে। সেক্ষেত্রে আমাদের মহাবিশ্ব সসীম হলেও, সামগ্রিক মহাজগৎ বা মাল্টিভার্স হতে পারে এক অনন্ত সমুদ্র।আরো পড়ুনঃ আমাদের গ্যালাক্সির নাম কি?
মহাজাগতিক দিগন্ত
সমুদ্রে যেমন এক নির্দিষ্ট দূরত্বের পর আর কিছু দেখা যায় না, মহাকাশেও তেমনি একটি 'দিগন্ত' আছে। একে বলা হয় মহাজাগতিক দিগন্ত। ডার্ক এনার্জির কারণে অনেক গ্যালাক্সি এত দ্রুত আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে যে তাদের আলো কোনোদিন আমাদের কাছে পৌঁছাবে না। এই দিগন্তের ওপারে কী আছে, তা আমাদের কাছে চিরকাল অজানা থেকে যেতে পারে। এই রহস্যময় 'অদেখা' অংশটিই অসীম মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় হাতছানি।পদার্থের সুষম বিন্যাস
আমরা যদি মহাবিশ্বের দিকে বড় স্কেলে তাকাই, দেখব গ্যালাক্সিগুলো এলোমেলো নয় বরং এক বিশাল জালের মতো সাজানো। এই 'কসমিক ওয়েব' পুরো মহাবিশ্বে অদ্ভুতভাবে সুষম। একদিকের ঘনত্ব আর অন্যদিকের ঘনত্ব প্রায় সমান। এই ভারসাম্যই বলে দেয় যে মহাবিশ্বের কোনো বিশেষ কেন্দ্র বা শেষ নেই। এটি সবদিকে সমানভাবে ছড়িয়ে আছে, যা কেবল একটি অসীম মহাবিশ্বের পক্ষেই সম্ভব।বিগ ব্যাং
অনেকে মনে করেন বিগ ব্যাং মানে একটি ছোট বিন্দু থেকে মহাবিশ্বের জন্ম। কিন্তু তাত্ত্বিকভাবে, যদি মহাবিশ্ব এখন অসীম হয়, তবে শুরুর মুহূর্তেও এটি অসীম ছিল। তফাৎ শুধু এটুকুই যে তখন এটি ছিল অনেক বেশি ঘন এবং উত্তপ্ত। সময় হয়তো ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে শুরু হয়েছে, কিন্তু স্পেস বা স্থান তখন থেকেই অসীম থাকা সম্ভব। অর্থাৎ, মহাবিশ্বের বয়সের একটা শুরু থাকলেও এর আয়তনের কোনো শুরু নাও থাকতে পারে।![]() |
| মহাবিশ্বের বিশালতা |
মহাবিশ্ব কি সত্যিই অসীম? বিজ্ঞান হয়তো আজ পর্যন্ত এর চূড়ান্ত উত্তর দিতে পারেনি, কিন্তু অধিকাংশ প্রমাণ অসীমতার পক্ষেই সওয়াল করে। সমতল জ্যামিতি, ক্রমবর্ধমান প্রসারণ আর প্রান্তহীনতার হাতছানি—সবই যেন আমাদের এক অনন্ত জগতের গল্প শোনায়। এই বিশালতার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা বুঝতে পারি যে আমরা কত ক্ষুদ্র, অথচ আমাদের চিন্তা আর বিজ্ঞান কত বিশাল যা এই অসীমতাকে ছুঁতে চায়। মহাবিশ্ব অসীম হোক বা না হোক, এর অলিগলিতে লুকিয়ে থাকা রহস্যগুলো আমাদের চিরকাল বিস্ময়াভিভূত করে রাখবে।
তথ্য সূত্রঃ বিজ্ঞান চিন্তা
আরো পড়ুনঃ



