চাঁদ পৃথিবী থেকে কত দূরে আছে?

Zamil Islam
0

চাঁদ পৃথিবীর থেকে কত দূরে আছে?


রাতের আকাশের মায়াবী চাঁদকে দেখে কার না সাধ জাগে একবার ছুঁয়ে দেখতে? হাজার বছর ধরে এই চাঁদ আমাদের কবিদের কল্পনা আর বিজ্ঞানীদের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এই রুপালি গোলকটি আমাদের থেকে ঠিক কতটা দূরে? আপাতদৃষ্টিতে স্থির মনে হলেও, পৃথিবী আর চাঁদের এই দূরত্বের গল্পটা বেশ রোমাঞ্চকর।

how far is the moon from the earth
চাঁদের দূরুত্ব

গড় দূরত্ব: কতটা দূরে আমাদের প্রতিবেশী

সাধারণভাবে বললে, পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব প্রায় ৩,৮৪,৪০০ কিলোমিটার। সংখ্যাটা শুনে হয়তো খুব বেশি মনে হচ্ছে না, কিন্তু এর বিশালতা বোঝার জন্য একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। আমাদের সৌরজগতের বাকি সাতটি গ্রহকে যদি আপনি পাশাপাশি সারিবদ্ধভাবে সাজান, তবে তারা অনায়াসেই পৃথিবী আর চাঁদের মাঝখানের এই ফাঁকা জায়গায় জায়গা করে নিতে পারবে! আরও সহজ করে বললে, আপনি যদি একটি গাড়ি নিয়ে ঘণ্টায় ১০০ কিমি বেগে বিরতিহীনভাবে চাঁদের দিকে ছুটতে পারেন, তবে সেখানে পৌঁছাতে আপনার সময় লাগবে ১৬০ দিনেরও বেশি।

এক অদ্ভুত কক্ষপথ

চাঁদ কিন্তু পৃথিবীকে একদম গোল হয়ে প্রদক্ষিণ করে না। এর পথটি অনেকটা ডিমের মতো বা উপবৃত্তাকার। এই আঁকাবাঁকা পথের কারণেই চাঁদ কখনো আমাদের খুব কাছে চলে আসে, আবার কখনো অভিমানী বন্ধুর মতো দূরে সরে যায়। কক্ষপথের এই খামখেয়ালিপনার কারণে দুটি মজার অবস্থার সৃষ্টি হয়: পেরিজি এবং অ্যাপোজি।


পেরিজি ও সুপারমুন: যখন চাঁদ খুব কাছে

চাঁদ যখন তার কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে চলে আসে, সেই বিন্দুটিকে বলা হয় পেরিজি। এই সময় দূরত্ব কমে দাঁড়ায় প্রায় ৩,৬৩,৩০০ কিলোমিটারে। আর এই সময়েই যদি পূর্ণিমা হয়, তবে আমরা আকাশে দেখি সেই বিখ্যাত 'সুপারমুন'। তখন চাঁদকে সাধারণ সময়ের চেয়ে প্রায় ১৪% বড় এবং ৩০% বেশি উজ্জ্বল দেখায়। মনে হয় যেন আকাশ থেকে চাঁদটা আমাদের খুব কাছে নেমে এসেছে!

অ্যাপোজি ও মাইক্রোমুন: দূরত্বের নীরবতা

আবার চাঁদ যখন ঘুরতে ঘুরতে পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে চলে যায়, তখন তাকে বলা হয় অ্যাপোজি। তখন দূরত্ব বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪,০৫,৫০০ কিলোমিটার। এই দূরত্বের কারণে পূর্ণিমা হলেও চাঁদকে কিছুটা ছোট আর ম্লান দেখায়, যাকে আমরা ডাকি 'মাইক্রোমুন' নামে। প্রকৃতির এই ভারসাম্য সত্যিই অদ্ভুত, তাই না?

আলোর গতি ও সময়ের খেলা

আমরা যখন আকাশের চাঁদের দিকে তাকাই, তখন কিন্তু আমরা বর্তমানের চাঁদকে দেখি না! অবাক হচ্ছেন? চাঁদ থেকে আলো (যা আসলে সূর্যের প্রতিফলন) পৃথিবীতে পৌঁছাতে সময় নেয় প্রায় ১.৩ সেকেন্ড। অর্থাৎ, আপনি এখন যে চাঁদটি দেখছেন, সেটি আসলে ১.৩ সেকেন্ড আগের চাঁদ। মহাবিশ্বের বিশালতার তুলনায় এই সময়টুকু সামান্য হলেও, এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা সময়ের এক বিশাল প্রবাহের মধ্যে বাস করছি।


সমুদ্রের ওপর চাঁদের টান

চাঁদের এই কাছে আসা বা দূরে যাওয়ার প্রভাব কেবল আকাশেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি আমাদের সমুদ্রের ওপরও খবরদারি করে। যখন চাঁদ পৃথিবীর কাছে (পেরিজি) থাকে, তার মহাকর্ষীয় টান বেড়ে যায়, ফলে জোয়ারগুলো হয় অনেক বেশি শক্তিশালী। আবার অ্যাপোজির সময় এই টান কিছুটা শিথিল হয়ে পড়ে। পৃথিবীর প্রাণস্পন্দন আর সমুদ্রের ছন্দের পেছনে এই দূরত্বের এক বিশাল ভূমিকা রয়েছে।

আমরা কি চাঁদকে হারিয়ে ফেলছি?

বিজ্ঞানীরা এক অদ্ভুত তথ্য দিয়েছেন—চাঁদ কিন্তু স্থির হয়ে বসে নেই। সে প্রতি বছর আমাদের কাছ থেকে প্রায় ৩.৮ সেন্টিমিটার করে দূরে সরে যাচ্ছে। ভাবছেন এটা তো খুব সামান্য! কিন্তু লক্ষ লক্ষ বছর পর এই ছোট ব্যবধানটাই অনেক বড় হয়ে দাঁড়াবে। পৃথিবীর ঘূর্ণন আর জোয়ার-ভাটায় শক্তির বিনিময়ের কারণেই এই ধীর প্রস্থান ঘটছে।

the changing phases of the moon
চাঁদের রুপবদল

চাঁদের রূপবদল

আকাশের বুকে চাঁদের রূপবদল আমাদের চিরচেনা এক বিস্ময়। কখনো এক ফালি সরু রেখা, আবার কখনো পূর্ণ থালার মতো উজ্জ্বল গোলক—চাঁদের এই যে প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া রূপ, একেই আমরা বলি 'চাঁদের কলা'। আদতে চাঁদের নিজস্ব কোনো আলো নেই; সে কেবল দর্পণের মতো সূর্যের আলো প্রতিফলন করে। চাঁদ যখন পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে, তখন সূর্য ও পৃথিবীর সাপেক্ষে এর অবস্থান বদলে যায়। ফলে পৃথিবী থেকে আমরা চাঁদের আলোকিত অংশের যতটুকু দেখতে পাই, সেটাই আমাদের চোখে একেকটা ধাপ বা 'ফেজ' হয়ে ধরা দেয়।

একটি পূর্ণ চক্রে চাঁদ মূলত আটটি প্রধান দশার মধ্য দিয়ে যায়। অমাবস্যার সময় চাঁদ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে থাকে বলে এর আলোকিত পিঠটি আমাদের উল্টো দিকে থাকে, ফলে আকাশ থাকে অন্ধকার। এরপর ক্রমান্বয়ে সরু এক ফালি চাঁদ বা ক্রমবর্ধমান অর্ধচন্দ্র দেখা যায়, যা বাড়তে বাড়তে প্রথম চতুর্থাংশ এবং তারপর অর্ধেকের বেশি বা গিবাস অবস্থায় পৌঁছায়। পূর্ণিমার রাতে পৃথিবী যখন চাঁদ ও সূর্যের মাঝখানে আসে, তখন আমরা চাঁদের পুরো আলোকিত দিকটি দেখতে পাই। এরপর শুরু হয় উল্টো যাত্রা; কৃষ্ণ পক্ষের গিবাস থেকে ক্ষয়ে যেতে যেতে শেষ চতুর্থাংশ এবং সবশেষে পুনরায় সরু রেখায় পরিণত হয়ে চাঁদ আবার অমাবস্যার অন্ধকারে মিশে যায়।

চাঁদে মানুষের পদচিহ্ন

১৯৬৯ সালে যখন মানুষ প্রথম চাঁদে পা রেখেছিল, তখন অ্যাপোলো ১১ মিশনে মহাকাশচারীদের এই ৩,৮৪,৪০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লেগেছিল প্রায় তিন দিন। বর্তমানে আমরা আবার চাঁদে যাওয়ার পরিকল্পনা করছি, কারণ এই দূরত্ব জয় করাই হবে আমাদের পরবর্তী মহাকাশ অভিযানের (যেমন মঙ্গল গ্রহ) প্রথম ধাপ।

শেষ কথা

চাঁদের দূরত্ব কেবল একটি সংখ্যা নয়; এটি মহাবিশ্বের এক নিখুঁত গাণিতিক নকশা। এর মাধ্যমেই নির্ধারিত হয় আমাদের জোয়ার-ভাটা, আমাদের রাতের আকাশ আর মহাকাশ বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ। চাঁদ দূরে সরে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবে সে এখনো আমাদের আকাশকে আলো করে আছে, ঠিক যেন এক প্রাচীন প্রহরীর মতো।

prigee and apogee
অনুভূ ও অপভূ


তথ্য সূত্রঃ উইকিপিডিয়া

আরো পড়ুনঃ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!