যে নদীর গভীরতা বেশি তার বয়ে যাওয়ার শব্দ কম। মনীষীদের বাণী বিশ্লেষণ

Zamil Islam
0

যে নদীর গভীরতা বেশি তার বয়ে যাওয়ার শব্দ কম: জীবনদর্শনের এক গভীর বিশ্লেষণ


প্রকৃতি আমাদের পরম শিক্ষক। আর শিক্ষকের কাছে অনেক কিছুই শেখার থাকে। শিক্ষকেরা যেমন আমাদের কে শেখায় জীবনের কোথায় কিভাবে চলতে হয়। ঠিক তেমনিভাবেই প্রকৃতির কাছে থেকেও আমাদের শেখার আছে অনেক কিছুই। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের মধ্যে লুকিয়ে আছে আমাদের জীবন চলার পথের কোনো না কোনো গূঢ় সত্য। তেমনি একটি পরম সত্য হলো—যে নদীর গভীরতা বেশি তার বয়ে যাওয়ার শব্দও অনেক কম। এই প্রাচীন প্রবাদটি কেবল একটি ভৌগোলিক সত্য বিষয়ই নয়। বরং এই বিখ্যাত উক্তিটি যেনো মানব চরিত্রেরই গভীরতা, জ্ঞান এবং ব্যক্তিত্বের এক অনন্য প্রতিফলন।

আজ আমরা এই আর্টিকেলে আলোচনা করবো কেনো আমাদের অতি পরিচিত বিখ্যাত এই প্রবাদটি আজও এতো প্রাসঙ্গিক এবং আমাদের বাস্তব জীবনে এর গুরুত্বই বা কতটুকু।

যে নদীর গভীরতা বেশি তার বয়ে যাওয়ার শব্দ কম এর ব্যাখ্যা চিত্র
ziodop.com


প্রকৃতির নিয়ম ও গভীর নদীর শান্ত রূপঃ

আপনি যদি কখনো কোনো পাহাড়ী ঝর্ণায় গিয়ে থাকেন, তাহলে বিষয়টি খুব সহজে বুঝতে পারবেন। আমি যদি আপনাকে জিজ্ঞাসা করি যে, পাহাড় থেকে যখন ঝর্ণার জল নিচে পড়ে, তখন কি ঝর্ণার এই জল অনেক শব্দ করে পড়ে নাকি এই জল নীরবে পড়ে? তাহলে আপনি হয়তো বলবেন যে, ঝর্ণার জল প্রচন্ড শব্দ করে পড়ে। এখন আপনি কি বলতে পারবেন এর কারন কি? কারণ হলো সেখানে জলের প্রবহমানতা কম। নদীর গভীরতা সেখানে নেই বললেই চলে। কিন্তু আমরা যখন কোনো বিশাল নদী; যেমন- পদ্মা, মেঘনা কিংবা যমুনার জলের শান্ত প্রবাহ দেখি, তখন সেখানে নদীর কোনো গর্জন নেই। এর কারণ হলো গভীরতা। যে নদীর গভীরতা যতো বেশি হবে বা তার তলদেশ যতো গভীরে, সেই নদীর জলরাশিও ততো বেশি স্থির ও শান্ত।


যে নদীর গভীরতা বেশি তার বয়ে যাওয়ার শব্দও কম—চিরন্তন এই প্রাকৃতিক সত্যটি থেকে আমরা শিখি যে, যার কাছে দেওয়ার মতো অনেক কিছু থাকে, সে কখনো অযথা আওয়াজ বা প্রচার করে না। তার শান্ত স্বভাবের প্রকৃতির অস্তিত্বই তার গভীরতার পরিচয় বহন করে।


মানুষের জ্ঞান ও ব্যক্তিত্বের গভীরতাঃ

প্রকৃতির এই চিরচেনা নিয়ম বিধাতার শ্রেষ্ঠ জীব মানুষের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। আমাদের ঘুণেধরা সমাজে আমরা সাধারণত দুই ধরনের মানুষদেরকে দেখি। একদল কপট মানুষ আছে, যাদের জ্ঞান খুবই সীমিত। কিন্তু তারা সেই সীমিত জ্ঞান নিয়েই নিজেদেরকে অন্যদের কাছে জ্ঞানী হিসেবে জাহির করতে পছন্দ করেন। অপর দিকে, এমন কিছু বিনয়ী মানুষ আছেন, যারা প্রকৃতপক্ষেই জ্ঞানী, ভদ্র, নমনীয় এবং অভিজ্ঞ। আর তারা স্বভাবের দিক দিয়েও খুবই বিনয়ী এবং শান্ত। তারা কখনোই অন্যদের কাছে নিজেদেরকে জ্ঞানী হিসেবে জাহির করে না। কারণ তাদের বিনয়ের গাম্ভীর্যতা এবং মাধুর্যতাই তাদের অনন্যতার জানান দেয়।

অল্প বিদ্যা ভয়ংকরী ও অগভীর মানুষের আচরণঃ


কথায় আছে, "ফাঁকা কলস বাজে বেশি"। যার ভেতরের সারবস্তু কম বা অন্তঃস্বার শুন্য, সে সর্বদা নিজের ঢাক পেটায়। সে অযথাই অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে নিজেকে সবার কাছে বড় প্রমাণ করার চেষ্টা করে। স্বল্প বা অগভীর জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিরা সাধারণত বেশিরভাগ সময়েই অন্যদের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। অন্যের ওপর নিজের মতামত চাপিয়ে দিতে চান। কিন্তু যেসব ব্যক্তিরা যে নদীর গভীরতা বেশি, তার বয়ে যাওয়ার শব্দ কম- এই মূলমন্ত্রটি মনেপ্রাণে ধারণ করেন, তারা জানেন যে সত্য এবং জ্ঞান প্রমাণের জন্য কখনো উচ্চবাচ্য অথবা প্রচারনার দরকার হয় না।

জ্ঞানী মানুষের নীরবতা ও গাম্ভীর্যঃ

একজন প্রকৃত জ্ঞানী মানুষের বড় গুণ হলো তার নীরবতা। নীরবতাই হলো তার প্রকৃত সৌন্দর্য। তিনি শোনেন বেশি এবং বলেন কম। তার চরিত্রের কোমলতা ও নমনীয়তা সবার কাছে আপনা আপনিই বিমূর্ত হয়ে উঠে। সক্রেটিস, এরিস্টটল বা আইনস্টাইনের মতো মনীষীদের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তারা খুবই সাধারণ জীবন যাপন করতেন। খুব প্রয়োজন ছাড়া তারা কখনো অন্যদের কাছে নিজেকে মেলে ধরতেন না। তাদের ব্যক্তিত্বের গভীরতা এতোটাই বেশি ছিলো যে, তাদের কাজের মাধ্যমেই তারা বিশ্বজুড়ে পরিচিত ও নন্দিত হয়েছেন। তর্কের মাধ্যমে কিংবা নিজেকে জাহির করার মাধ্যমে নয়।

সাফল্যের পথে নীরবতা ও কঠোর পরিশ্রমঃ

বর্তমানের এই  আধুনিক পৃথিবীতে একটি জনপ্রিয় কথা আছে— "Work hard in silence, let your success be your noise."। অর্থাৎ, নীরবে কঠোর পরিশ্রম করে যাও এবং তোমার সাফল্যকেই কথা বলতে দাও। স্বল্প দৈর্ঘ্যের এই বাক্যটি সরাসরিই যেনো যে নদীর গভীরতা বেশি তার বয়ে যাওয়ার শব্দ কম এই প্রবাদটিকেই সমর্থন করে।

জীবনে যারা বড় লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেন, তারা তাদের পরিকল্পনা বা পরিশ্রম নিয়ে খুব বেশি ঢাকঢোল পেটান না। তারা জানেন যে,অযথা শব্দ বা আওয়াজ শক্তির অপচয় করে। বরং সেই শক্তিকে তারা নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের পিছনে ব্যয় করেন। সফল মহান ব্যক্তিদের এই গাম্ভীর্যই তাদেরকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।


যে নদীর গভীরতা বেশি তার বয়ে যাওয়ার শব্দ কম- প্রবাদটির ভাবসম্প্রসারণ ও মূলভাবঃ


স্কুল, কলেজ বা ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের জন্য চিরন্তন এই প্রবাদটির ভাবসম্প্রসারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মূলভাব হলো—অহংকার এবং বাহ্যিক আড়ম্বর মানুষের তুচ্ছতাকে প্রকাশ করে। অন্যদিকে, ধৈর্য, বিনয় এবং গাম্ভীর্য মানুষকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

জীবনে কেনো নদীর মতো গভীরতা অর্জন করা প্রয়োজন?

১. স্থিরতা: গভীরতা মানুষকে অস্থিরতা থেকে মুক্তি দেয়। যেকোনো সংকটে স্থির থাকা গভীর ব্যক্তিত্বের লক্ষণ। সুন্দর ব্যক্তিত্ব অর্জনের প্রথম ধাপ হচ্ছে স্থিরতা।

২. সম্মান: সমাজে শান্ত এবং গম্ভীর মানুষকে সবাই সম্মান করে। অতিরিক্ত বাচালতা মানুষের ব্যক্তিত্বকে হালকা করে দেয়। মানুষের সম্মান নষ্ট করে।

৩. সিদ্ধান্ত গ্রহণ: গভীর চিন্তাশীল ব্যক্তিরা জীবনের বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো খুব নিখুঁতভাবে নিতে পারেন। তাই তারা জীবনের বিভিন্ন পদে পদে বাধা বিপত্তির সম্মুখীন হলেও সেটা থেকে খুব দ্রুত মুক্তিও পেয়ে যান।

আধ্যাত্মিকতা ও আত্মিক গভীরতাঃ


সুফি দর্শন বা আধ্যাত্মিক সাধনায় নীরবতাকে পরম সম্পদ মনে করা হয়। বলা হয়, স্রষ্টার সাথে যোগাযোগের শ্রেষ্ঠ ভাষা হলো বিনয়, কোমলতা ও নীরবতা। যার অন্তরে ভক্তি বা প্রেমের গভীরতা যতো বেশি, তার বাহ্যিক প্রকাশ ততো কম। তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে নিজের সাধনা নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যান। এখানেও সেই একই সত্য দিনের আলোর মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠে —যে নদীর গভীরতা বেশি তার বয়ে যাওয়ার শব্দ কম।

ব্যক্তিগত জীবনে গভীরতা আনবেন কিভাবেঃ


আমরা চাইলেই কিছু স্বভাব রপ্ত করার মাধ্যমে আমাদের ব্যক্তিত্বে শান্ত নদীর মতো গভীরতা নিয়ে আসতে পারি। আমাদের বাস্তবিক জীবনকে করে তুলতে পারি আরো অর্থবহুল। তবে এর জন্য কিছু জিনিস চর্চা করা আমাদের জন্য খুবই প্রয়োজন। যেমন:

* বেশি শুনুন, কম বলুনঃ অন্যের কথা শোনার অভ্যাস করলে জ্ঞান বাড়ে এবং ব্যক্তিত্ব গম্ভীর হয়।

* অযথা তর্ক এড়িয়ে চলুনঃ অগভীর মানুষের সাথে তর্কে জড়িয়ে নিজের সময়ের অপচয় করবেন না।

* জ্ঞান অন্বেষণ করুনঃ যতো বেশি পড়বেন এবং জানবেন, আপনার ভেতরে ততো বেশি বিনয় তৈরি হবে।

* পরনিন্দা ত্যাগ করুনঃ গভীর ব্যক্তিত্বের মানুষ কখনো অন্যের সমালোচনা বা গীবত করে অযথা নিজের মূল্যবান সময় নষ্ট করে না। তাই এটিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে যতো দ্রুত সম্ভব পরিত্যাগ করতে হবে।


প্রবাদ বাক্যটির সামাজিক প্রভাব ও বর্তমান প্রেক্ষাপটঃ


বর্তমান এই সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে আমরা সবাই নিজেকে জাহির করতেই সদা ব্যস্ত। কে কি খাচ্ছি, কি করছি, কোথায় যাচ্ছি—সবই মানুষকে দেখানোর যেনো কোনো এক ঐশ্বরিক প্রতিযোগিতা চলছে। কিন্তু এই ভার্চুয়াল কোলাহলের মাঝেও যারা প্রকৃত সুখী এবং সফল, তারা প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকতেই পছন্দ করেন। বর্তমান এই ঘুণেধরা ও পচনশীল সমাজের তরুণ প্রজন্মের জন্য "যে নদীর গভীরতা যতো  বেশি, তার বয়ে যাওয়ার শব্দ ততো কম" এই প্রবাদটির শিক্ষা গ্রহণ করা ও এর মাহাত্ব্য অনুধাবন করা অত্যন্ত জরুরী। এটি আমাদের শেখায় যে, নিজেকে বড় দেখানোর চেয়ে বড় হয়ে ওঠাটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


পরিশেষে বলা যায়, যে নদীর গভীরতা বেশি তার বয়ে যাওয়ার শব্দ কম—এটি কেবল একটি প্রবাদ বাক্য নয়। এটি একটি জীবন দর্শন। আর জীবনে যদি কোনো দর্শনই না থাকে, তাহলে সে জীবন মূল্যহীন। আমাদের জীবন অগভীর। আর অগভীর জীবনের কোলাহল ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু গভীর জীবনের নীরবতা চিরস্থায়ী এবং প্রভাবশালী। তাই আসুন আমরা প্রত্যেকেই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নদীর মতোই গভীর এবং গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করি। নিজেকে প্রকাশের চেয়ে নিজের যোগ্যতা বাড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগ দিই। তবেই আমাদের জীবন হবে প্রকৃত সার্থক এবং সুন্দর।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!