নদী গল্প। শেষ পর্ব। জামিল ইসলামের গল্প

Zamil Islam
0

নদী

জামিল ইসলাম

শেষ পর্ব

ziodop.com
ziodop.com

মেয়ের কষ্ট সহ্য করতে পারেন না তিনি। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে শুধু কান্না করেন আর আল্লাহ কে ডাকেন। নিজের প্রাণের বিনিময়েও তিনি মেয়েকে সুস্থ দেখতে চান। মেয়ের সুস্থতার জন্য তিনি আল্লাহর দরগায় নানান মানত করেন। মেয়ের কল্যাণের জন্য কোনো কিছু করতে বাদ দেন না তিনি।

দিন কাটতে থাকে।

এমন করেই কেটে যায় অনেকগুলো দিন।

প্রতুলের ছোট আরো তিনজন ভাইবোন আছে। দুই বোন আর এক ছোট ভাই। নিজে বেশি পড়াশোনা করতে না পারলেও প্রতুল ছোট ভাইবোনদের ঠিকই পড়াশোনা করায়। শত কষ্ট হলেও সে থামে না। হাল ছাড়ে না। বয়সের অভিজ্ঞতা তাকে নতুন উদ্যমে কাজ করতে শেখায়।

বয়সের কোঠায় দুই যুগের কিঞ্চিত বেশি পেরিয়েছে প্রতুল। জীবনটা বড়ই আশ্চর্যের মনে হয় তার কাছে। কোথায় দিয়ে সময়গুলো কেটে গেছে, কিছুই বুঝে উঠতে পারে না সে। এই তো সেদিন হাফ প্যান্ট ছেড়ে সবেমাত্র কৈশোরে পা দিয়েছে বলে তার কাছে মনে হয়। কিন্তু কোথায় দিয়ে যে এতোগুলো দিন কেটে গেলো, টেরই পায় নি যেনো। নদীর স্রোতের মতোই নিরন্তর বয়ে গেছে সময়।

বসন্তকাল এসে গেছে।

প্রকৃতিতে নতুনের আগমন ঘটেছে। আর নতুনকে বরণ করে নিতে প্রকৃতিও যেনো নতুন করে সেজে উঠেছে।

প্রতুল মাছ ধরতে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে ঘাটের দিকে চলেছে।

তার বাড়ি থেকে ঘাঁট বেশি দূরে নয়। বাড়ির উঠান পেরোলে রহিম শেখের বাড়ি। রহিম শেখের বাড়ির পূর্ব পাশ দিয়ে রাস্তা চলে গেছে নদীর দিকে। নয়-দশ বাড়ি পরে কুতুব মুন্সির তাল পুকুর। পুকুরটির চারপাশ তালগাছ দিয়ে ঘেরা। এজন্য পুকুরটির নাম তালপুকুর। এই পুকুর থেকে দুই মিনিটের মতো হাঁটলে নদীর ঘাট।

প্রতুল রাস্তাঘাটের চারপাশ দেখতে দেখতে যাচ্ছিলো। তার কাছে সবই যেনো নতুন লাগে। মনে হয় এগুলো সে আজই নতুন দেখছে। এ গ্রামে সে যেনো এক নতুন অতিথি। রাস্তার দুই পাশের গাছগুলো মনের ভেতরে চিত্রপটে ছবি আঁকতে আঁকতে সে ঘাটে পৌঁছে যায়।

ঘাটে পৌঁছে দেখে তার নৌকা পানিতে ডুবানো। ছোট ছেলেমেয়েরা আজও নিশ্চয় তার নৌকা নিয়ে নদীতে ঘুরে বেড়িয়েছে। তারপর এখানে এনে বেঁধে যাওয়ার সময় ডুবিয়ে দিয়ে গেছে। ঘাটে কেউ না থাকলে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা মাঝে মাঝেই তার নৌকা নিয়ে নদীতে ভেসে বেড়ায়। তারপরে যাওয়ার আগে এমন করে অর্ধেক ডুবিয়ে দিয়ে যায়। ঘাটের কিনারে এই জায়গাটিতে গভীরতা কম বলে নৌকা পুরোপুরি ডুবানো যায় না। এজন্যই অর্ধেক ডুবানো অবস্থায় থাকে।

মাঝে মাঝে প্রতুলের চোখে পড়ে। ছেলেমেয়েরা তখন ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। প্রতুল একটু আধটু ধমক দিলেও তেমন কিছু বলে না। ছোটবেলায় সে ও তার বন্ধুরা এমন কতো দুষ্টুমি করেছে। সেই স্মৃতি মনে পড়তেই বেদনাতুর হয়ে পড়ে। এসব স্মৃতি মনে করেই সে তাদেরকে তেমন কিছু বলে না।

প্রতুল ডুবে যাওয়া নৌকা উদ্ধার করতে নেমে পড়ে।

নৌকা উদ্ধার কার্য চালাতে গিয়ে প্রতুল বিড়বিড় করে একটা গান গাইছিলো। গান গাইতে গাইতে অর্ধ - ডুবন্ত নৌকা উদ্ধার করতে গিয়ে প্রতুলের মনে কি এক চিন্তার উদয় হয়। গভীর এক চিন্তার সাগরে ডুবে যায় সে।

সে ভাবছিলো তার মৃত বাবার কথা। ভাবছিলো তার মৃত দাদার কথা, কাকার কথা। আর সেই সাথে মিতার কথা।

মিতা!

হ্যাঁ মিতা। প্রতুল ভাবছিলো, তার জীবনটাও কি এই নৌকার মতোই অর্ধেক ডুবে যাবে? একজন মানুষ যদি পুরোপুরি ডুবে যায়; তাহলে সে আর বাঁচে না। মরে গিয়ে সে হয়তো জীবন নামের এক মহাযন্ত্রণা থেকে বেঁচে যায়। কিন্তু একজন অর্ধ ডুবন্ত মানুষ কি বাঁচতে পারে?

অনেক উত্তরই প্রতুলের মাথায় আসে। কিন্তু তার মধ্যে সঠিক উত্তর খুঁজে পায় না সে। পরে ভাবে, হয়তো পারে।

একজন অর্ধ ডুবন্ত মানুষ বাঁচলেও বাঁচতে পারে। কিন্তু সে পারবে না। মিতাকে ছাড়া তার জীবন দিকহারা ডুবন্ত এক তরীর মতোই। মিতাকে ছাড়া সে জীবন নামের অতল গহ্বরে ডুবে যাবে। এক অপার্থিব জগতের অন্ধকারে।

কিন্তু মিতা! সে কি এখনো বেঁচে আছে? প্রতুলের জীবনকে সাজাতে মিতা কি তবে আর এ জগতে নেই?

বিষন্নতায় ছেয়ে যায় প্রতুলের মুখ। পুরোনো দিনের কথা মনে পড়তেই তার চোখেমুখে যেনো অমাবস্যার গাঢ় অন্ধকার ঘনিয়ে আসে।

মনে নানান চিন্তা করতে করতে প্রতুলের নৌকা উদ্ধার করা শেষ হয়ে যায়। এখনি নৌকা নিয়ে ভেসে পড়বে নদীর বুকে। যে নদী তার ছোট্টবেলা থেকে মিশে রয়েছে অন্তরে, মনেপ্রাণে, দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে, রন্ধ্রে রন্ধ্রে, শিরা-উপশিরায়। তার অস্তিত্বে।

ঘাঁট থেকে নদীতে নৌকা ভাসাতে যাবে, এমন সময় পিছন থেকে কে যেনো প্রতুলের কাঁধে হাত রাখে। খানিকটা ভয় পেয়ে যায় প্রতুল।

কে?- বলেই সে পিছন ফিরে তাকায়।

ভয় পাইয়ো না। আমি। প্রতুলের কথার প্রত্যুত্তর আসে।

প্রতুল অবাক হয়ে যায়। সহসা উত্তর দিতে পারে না।

তোমার নায়ে আমারে নিবা নি মাঝি? আবার প্রতুলের দিকে প্রশ্নবাণ ছুঁড়ে দেয়।

এবার প্রতুলের মুখে হাসি ফুটে উঠে। সুখের হাসি। তৃপ্তির হাসি। মধুর হাসি।

মিতা দাঁড়িয়ে আছে প্রতুলের সামনে। সে এখন পুরোপুরি সুস্থ। আল্লাহ মিতার মায়ের দোয়া হয়তো কবুল করেছেন।

সন্তানের জন্য মায়ের চোখের জল মিশ্রিত কাকুতি কি আল্লাহ ফেলতে পারেন?

হ, নিমু তোমারে। চলো নায়ে যাইয়া বহো।

দুইজনে নৌকা নিয়ে তিস্তার জলে ঘুরে বেড়ায়। মিতা হাত দিয়ে নদীর পানি ছিটিয়ে খেলা করে। আর প্রতুলের দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হাসে। প্রতুলও এবার মিতার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দেয়।

তবে ওদের এ হাসি কি এমনি নিছক?

এ হাসি ওদের মধুর মিলনের। কারন সামনের বৈশাখ মাসে তাদের বিয়ে।

আরো পড়ুনঃ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!