শ্মশান ঘাট
জামিল ইসলাম
পর্বঃ০৪
আমরা আর বাড়ি গেলাম না। এখন বাড়ি গিয়ে ওদের বাবা-মাকে এসব কথা বলে শুধু শুধু ঝামেলা বাড়াতে চাইলাম না। আমরা সেখান থেকেই শ্মশানের দিকে রওনা দেই।
আমরা খেয়াল করলাম, চৌরাস্তার মোড় থেকে শ্মশান পর্যন্ত পুরো রাস্তাটাই বেশ নির্জন। মাঝে মাঝে দুয়েকটা পাখির ডাক ছাড়া আর কোনো কিছুর শব্দ নেই। যাওয়ার সময় ওরা দুইজন বারবার আমাদেরকে সাবধান করে দেয়। বলে -
আপনারা আমাদের এলাকায় নতুন আসছেন। তাই আপনারা এখানকার কিছুই জানেন না। শ্মশানের গিয়ে কোনো কিছুতে হাত দিবেন না।
আমরা ওদের কথা শুনতে শুনতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। বেশ কিছুটা এসে এখান থেকে আরেকটা রাস্তা অন্যদিকে চলে গেছে। ওখানে গিয়ে রইসের সাথে আমাদের দেখা হয়ে গেলো। রাস্তাটা রইসদের বাড়ির ওইদিক দিয়েই চলে গেছে। আমরা কোথায় যাচ্ছি জানতে চাইলে রইস কে আমাদের বৃত্তান্ত বললাম। আর রইস কে বলে-কয়ে আমাদের সাথে করে নিয়ে যাই। যতো লোক থাকবে মনে সাহস ততো বাড়বে। এখন আমরা আটজন হয়ে মনে অনেক বেশি সাহস পেলাম।
শ্মশানের উদ্দেশ্যে আমরা রওনা হলাম। যেতে যেতে আমাদের মনে ভয় এবং উত্তেজনা একসাথে কাজ করতে লাগলো। আমরা অবশেষে শ্মশানের গেটের সামনে এসে পৌঁছালাম। গেটটি অনেক পুরোনো। মরিচা ধরে গেছে। মরিচা ধরে গেটের জায়গায় জায়গায় ফুটো হয়ে গেছে। সামান্য ধাক্কা দিতেই গেটটি খুলে গেলো।
অ্যাই ছেলেরা!
কথাটি শুনে আমরা সবাই পেছন ফিরে তাকালাম।
দেখলাম আমাদের পিছনে একজন লম্বা মতো লোক। স্বাস্থ্যবান। কিন্তু দেখতে কালো।
তোমরা কোথায় যাচ্ছো? লোকটি জিজ্ঞাসা করলো।
জ্বি, আমরা শ্মশানের ভেতরে যাচ্ছি। আমি বললাম।
লোকটি আবার বললো- "কেনো? শ্মশানে তোমাদের কি দরকার?"
এই এমনিই একটু দেখতে যাচ্ছি। বললো রাজু।
এই জায়গাটা ভালো না। তোমরা এখান থেকে চলে যাও। এটাই তোমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো হবে। লোকটা আমাদের সাবধান করলো।
আমি লোকটাকে বললাম- "আসলে আঙ্কেল, আমরা ঢাকা থেকে এখানে বেড়াতে এসেছি। তাই এই শ্মশানটি আমরা একটু দেখতে এসেছি।
ঠিক আছে তোমরা যাও। তবে ভেতরে বেশি দেরি কোরো না। আর তোমাদের একটা কথা বলি- " এই শ্মশানের ভেতরে একটা মন্দির আছে। তোমরা ওই মন্দিরের ভেতরে যেয়ো না। আর যদি মন্দিরের ভেতরে যাও। তাহলে কোনো মূর্তি বা কোনো কিছুতে হাত দিয়ো না। এই বলে লোকটি সেখান থেকে চলে গেলো।
আমরা শ্মশানের ভেতরে ঢুকলাম। গেটের বাম পাশে তিন ফুটের মতো উঁচু করে দেয়াল করা। দেয়ালের ভেতরে একটু উঁচু ঢিপির মতো কিছু কি যেনো দেখলাম। এগুলো কি জানতে চাইলে, সজীব বলে-
এগুলো হচ্ছে কবর। যেসব হিন্দুদের লাশ পোড়ানোর সামর্থ নেই, তারা এখানে লাশ কবর দেয়।
দেয়াল দিয়ে ঘেরা জায়গাটিতে অনেক উঁচু উঁচু মেহগনি, কড়ই, সেগুন আর শিমুল গাছ শ্মশানের রুক্ষতাকে কাটিয়ে যেনো আকাশ ছুঁতে চাইছে।
কবরগুলোর উপর গাছের পাতা পড়ে এক হাতের মতো পুর হয়ে গেছে।
“আহ, এই জায়গাটা তো ভীষণ রোমাঞ্চকর!” রাজু বললো।
এমন সময় আমরা যেনো কোনো কিছুর শব্দ পেলাম। কারো হাঁটার শব্দ।
আমরা পিছন ফিরে তাকাই৷ দেখলাম একজন লোক শ্মশানের ভেতরে ঢুকলো। লোকটির স্বাস্থ্যও বেশ ভালো। পুরুষ্টু চেহারা। লোকটি আমাদের দিকে তাকিয়ে একটু দেখে তিনি তার মতো ভেতরের দিকে গেলেন। শ্মশানে কাজটাজ করতে লাগলেন।
রাজীব আর সজীব বললো ইনি এই শ্মশানের কর্তব্যরত ব্যাক্তি। এই শ্মশানের দেখাশোনা করেন।
যাক, এতোক্ষণে তাহলে এমন একজন কে পাওয়া গেলো। তিনি এখানে থাকলে আমাদের জন্য তো আরো ভালো। কোনো বিপদের মুখোমুখি হলে তিনি তো অন্তত এগিয়ে আসতে পারবেন। এটি ভেবে আমরা মনে আরো সাহস পেলাম।
আমরা সামনের দিকে একটু এগিয়ে গেলাম। শ্মশানের মাঝে ছোট একটি টিনের ঘর। ঘরের উত্তর আর দক্ষিণ পাশে বেড়ার সাথে কি যেনো টাঙানো। বোর্ডের মতো। সেখানে আমরা অনেকগুলো নাম দেখতে পেলাম। আমরা ওগুলো পড়ে বুঝলাম যে, এখানে যারা মারা গেছে বা যাদের পোড়ানো হয়েছে, এগুলো তাদেরই নাম।
এবার আমরা টিনের ঘর থেকে একটু পূর্ব দিকে গিয়ে উত্তরে দেয়াল ঘেরা কবরস্থানের কাছে গেলাম। এই কবরগুলো প্রথমে দেখা কবরগুলোর থেকে একটু বেশি উঁচু৷ আমরা কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কিছু কবরে লাগানো নামফলক থেকে তাদের নাম ও জন্ম-মৃত্যু তারিখ পড়তে শুরু করেছি যেই, এমন সময় হঠাৎই সোহান বলল-
ওই দেখ, ওখানে কী একটা আলো জ্বলছে!
সবাই সোহানের কাছে গেলাম। ও হাত দিয়ে যেদিকে ইশারা করছে সেদিকে তাকাতেই দেখলাম, টিনের ঘর থেকে পঞ্চাশ কি ষাট গজ দূরে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে একটা ছোট মন্দির। সেখান থেকে একটি অদ্ভুত সবুজ আলো আসছে। আমাদের কাছে প্রথমে ভ্রমের মতো মনে হলো৷ তারপর আমরা কাছে গিয়ে দেখতে পাই যে, আলোটা মন্দিরের ভিতর থেকেই আসছে।
চল, একটু দেখা যাক। টুটুল বললো।
আমরা মন্দিরের দিকে এগিয়ে গেলাম। মন্দিরের ভেতরে ঢুকতেই আমরা কিছু ভয়ানক ধরনের অদ্ভুত মূর্তি দেখতে পেলাম। রাক্ষসের দাঁতের মতো বড় বড় দাঁত মূর্তিগুলোর। চোখগুলো অনেক বড় বড়। জিহবা বের হয়ে রয়েছে। আমাদের মনে তখন একটু ভয় ভয় কাজ করছে। মূর্তিগুলো সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে ছিল। এমনভাবে তাকিয়ে ছিলো যেনো চোখ দিয়ে কাউকে গিলে খাবে। টুটুল আর সোহান একটা জিনিস খেয়াল করলো, মূর্তিগুলোর চোখ থেকে যেনো অশ্রু ঝরছিলো।
দেখ দেখ, মূর্তিগুলোর চোখ থেকে পানি পড়ছে। সোহান বললো।
তখন টুটুলও সোহানের সাথে তাল মিলিয়ে বললো- হ্যাঁ, তাই তো দেখছি। মনে হচ্ছে মূর্তিগুলো যেনো কাঁদছে।
কোথায়? তোরা মূর্তির চোখে পানি কোথায় দেখছিস? আমি তো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। রাজু বললো।
আমরাও কিছু দেখতে পাচ্ছি না। আমি আর সুমন বললাম।
রাজীব কি জানি কি ভেবে বললো- "আমার মনে হয় এখান থেকে এখন আমাদের যাওয়া উচিত।
আমরা চলে যেতে চাইলেও টুটুল আর সোহান ওখানে আর কিছুক্ষণ দেরি করার কথা বলে।
সুমন বলে- এটি একটি অশুভ স্থান। আমাদের এখানে বেশিক্ষণ থাকা একদম ই উচিত নয়।
কিন্তু টুটুল মাথা নেড়ে বলল- দাঁড়া, অন্তত এই অদ্ভুত আলোর উৎস কোথায়, তা একটু দেখা যাক। এই বলে টুটুল মূর্তির দিকে এগিয়ে যায়। এগোতে গিয়ে নিচে পড়ে থাকা কিসের সাথে যেনো হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। পড়ে যাওয়ার সময় ওর সাথে লেগে একটা মূর্তির হাত ভেঙে যায়। রাজু ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে ওকে টেনে তুলে।
টুটুল উঠে দাঁড়িয়ে হাত-পা ঝাড়তে থাকে।
আমরা আমাদের মতো আবার সবুজ আলোর উৎস কোথায়, তা খুঁজতে লাগলাম। এরই মধ্যে আমরা বুঝতে পারলাম যে, জোরে বাতাস বইতে শুরু করলো। আর ধীরে ধীরে খুব দ্রুতই প্রচন্ড ঝড় শুরু হয়ে গেলো। আমাদের মাঝে একধরনের শিহরণ তৈরি হলো। আমরা শুনতে পেলাম কিসের একটা চাঁপা আর্তনাদ। আমাদের হৃদস্পন্দন দ্রুত বাড়তে লাগলো। কিছুক্ষণ পরেই বাতাস আবার থেমে গেলো।
এটা কি? মুর্তির পাশে ত্রিশূলের মতো কি একটা দেখিয়ে রাজু ভীত হয়ে সজীবকে জিজ্ঞাসা করে।
আমি জানি না। চলো, এখান থেকে আমরা এখন চলে যাই। সজীবের উত্তর।
এমন সময় সোহান হঠাৎ চিৎকার করে বললো।-
ওই দেখ, মূর্তিগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখ।
মন্দিরের ভেতরের মূর্তিগুলো যেনো তীব্র গর্জন করছে। আবার পুরো শ্মশানে তীব্র জোরে বাতাস বইতে লাগলো। চারপাশে অন্ধকার ঘনিয়ে এলো। আর আমরা সবাই যেনো অদৃশ্য কোনো শক্তির দ্বারা আবদ্ধ হয়ে পড়লাম। মন্দিরের মূর্তিগুলো আমাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। এবার মূর্তিগুলোর দিকে তাকাতেই দেখি ওখানে একজন ব্যক্তি ভয়ানক দৃষ্টিতে ক্রোধ নিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। ওই ব্যাক্তি আর কেউ নয়.....
শেষ পর্ব
আরো পড়ুনঃ

